লিসা ও ড্যনিয়েল জাহাজে করে চলে আসলো ইতালির ভেনিস শহরে।
নৌকা এসে থামলো শহরের ঘাটে। ড্যনিয়েল নিজে প্রথমে নামলেন। তারপর লিসার হাত ধরে নৌকা থেকে নামালেন। লিসা জানে না তার বাবা তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে।
শহরে হাটতে হাটতে ড্যনিয়েল চাপা গলায় বলল, এই শহরে আমাদের কেউ চিনে না। আমরা যে আদম পরিবার সেটা এখানকার লোকজন হয়তো মেনে নিবে না। তাই তুমি পরিচয় দিবে আমার স্ত্রী হিসেবে। তোমাকে এখানে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিব। চিন্তা করো না আমরা এখানে কয়েক মাস থাকবো। তারপর আমরা আমেরিকা চলে যাবো সেখানে স্যাটানিক চার্চ আছে। ওখানে আমাদের সহজে গ্রহন করবে।
হাটতে হাটতে দুজনে একটা চার্চের কাছে আসলো।
ড্যনিয়েল ফাদারকে দেখে জড়িয়ে ধরলো। লিসা চুপচাপ দাড়িয়ে তার পাশে।
ড্যনিয়েল বলল, কেমন আছেন ফাদার? চিনতে পেরেছেন?
ফাদার একটু অবাক হয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বললেন, হ্যা। তুমি সেই ছোটবেলায় একবার তোমার বাবার সাথে এসেছিলে এখানে। অনেক বড় হয়ে গেছো? সাথে এটা কে? তোমার মেয়ে?
ড্যনিয়েল কথার পাশ কাটিয়ে বলল, আমরা এখানে কয়েকদিন থাকবো। ব্যবস্থা করে দিন।
ফাদার একটু ভেবে বললেন, আমার যে পুরানো বাড়ি আছে। ওখানে তোমরা থাকতে পারো। কোন সমস্যা নেই।
ড্যনিয়েল বলল, ধন্যবাদ ফাদার। বড় উপকার করলেন।
ফাদার দু'হাত উচু করে তালি দিতেই ঘরের ভেতর থেকে এক সুদর্শন যুবক ছেলে এসে হাজির হলো। একবার তাকালো লিসার দিকে তারপর আবার চোখ নামিয়ে ফেলল।
ছেলেটা বলল, জি ফাদার ডেকেছেন?
ফাদার বললেন, আন্টোনি। ওনাদের আমার পুরান বাড়িতে নিয়ে যাও। আমাদের মেহমান ইনারা।
আন্টোনি বলল, অবশ্যই।
এই লাজুক ছেলেটাকে দেখে লিসার অন্যরকম একটা অনুভূতি হলো। যেটা সে সবসময় তার বন্ধ ঘরের দরজায় বইতে পড়েছিল। সেই অনুভূতি, তাহলে এটাই কি প্রেম।
আন্টোনি বলল, আসুন আমার সাথে।
তারপর আন্টোনি, লিসা ও ড্যনিয়েল রাস্তায় হাটতে লাগলো।
আন্টোনি বলল, এখানে বাড়িগুলো নদীর ওপর। আশাকরি ভয় পাবেন না।
ড্যনিয়েল বলল, আমরা দ্বীপে ছিলাম। চারিদিকে নদী ই ছিল। যাই হোক, তুমি চার্চে কিভাবে?
আন্টোনি বলল, আমার বাবা মা ছোটবেলায় মারা যায়। তারপর ফাদার আমাকে দত্তক নেন। এবং ছোটবেলা থেকেই চার্চে বড় হয়েছি। এখানেই থাকি।
কথাটা শুনে খুব মায়া হয় লিসার। তার মন চায় ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে।
বাড়ির কাছে এসে পড়ে তারা। এবার বিদায় নেওয়ার পালা।
ড্যনিয়েল পকেট থেকে টাকা হাতে দেয় আন্টোনির।
আন্টোনি বলে, টাকা পয়সা আমার কাছে কোন মূল্য নাই।
ড্যনিয়েল হেসে বলে, রেখে দাও। তুমি তো যিশুখ্রিস্ট নও। টাকা পয়সা অবশ্যই দরকার আছে।
আন্টোনি কথা বাড়ায় না চলে যায়। চোখের পলক না ফেলে তাকিয়ে থাকে লিসা। কি সুদর্শন ছেলে। যেন তার মাথা থেকে ছেলেটার ছবি যাচ্ছিল না। লিসা যে তাকিয়ে আছে সেটা ড্যনিয়েল লক্ষ্য করে। তবে কিছু বলে না। চাবি দিয়ে দরজা খুলে দেয় ড্যনিয়েল।
রাতেরবেলা বিছানায় এপাশ অপাশ করেও ঘুম আসছে না লিসার। সারাক্ষণ শুধু এন্টোনির কথা ভেবে চলেছে। হঠাৎ চেখ বন্ধ করলে দেখছে এন্টোনি ঘোড়ায় চলে রাজকুমার হয়ে তাকে নিয়ে আসছে দরজার কাছে। চোখ খুলতেই লজ্জায় লাল হয়ে যায় সে। আয়নায় নিজেকে একবার দেখে লিসা। সবুজ চোখ তার লাল কোকড়ানো চুল কোমড় অবধি দিয়ে পড়েছে। তবুও লিসা ভাবে এন্টোনি কি তাকে ভালোবাসবে? আর এই ভালোবাসা কি তার পিতা মেনে নিবে?
তাদের পরিবার আদম পরিবার। এখানে পারিবারিক ভাবে নিজেরা নিজেরা বিয়ে করে। বাচ্চা জন্ম দেয়। সেখানে বাইরের কারো সাথে বিয়ে প্রেম এসব গ্রহনযোগ্য না। এর আগেও ড্যনিয়েল তার স্ত্রী পরোকিয়া করায় যে ডেভিড হয়েছিল তাকে প্রতিদিন বেল্ট দিয়ে পেটাতো। তো লিসা চায় না তার জন্য এন্টোনির কোন ক্ষতি হোক। আবার নিজের অনুভূতি কেও আটকে রাখতে পারে না।
লিসা ভাবলো বইতে সে রোমিও জুলিয়েট পড়েছে। আরো অনেক রোমান্টিক উপন্যাস পড়েছে।।সেখানে তো কেউ পরিবার এর সাথে বিয়ে করে না। তাহলে তার পরিবার ই কেন এরকম করে? তার পূর্বপুরুষ 'আদম ধর্ম' বানিয়েছিল। কেন এখনও সেই পুরানো নিয়মে চলতে হবে? আমাদের কি নতুন নিয়ম বানানো যায় না?
লিসা শুয়ে ছিল বিছানায়। হঠাৎ তার বাবা ড্যনিয়েল দরজা খুলে ঘরের ভেতর ঢুকলো।
ড্যনিয়েল নিজের জামা কাপড় খুলে ফেলল।
চাদরের ভেতর ঢুকে পড়লো লিসার পাশে। হঠাৎ কেন জানি লিসার খুব অসস্তি লাগতে লাগলো আর ভয় পেতে লাগলো। এর আগে তো কখনও এমন হয়নি তার।
ড্যনিয়েল একটা হাত রাখলো লিসার বুকের ওপর। বিরক্ত হয়ে লিসা হাত সড়িয়ে দিল।
ড্যনিয়েল অবাক হলেন। হঠাৎ লিসা এরকম আচরনের কারন কি হতে পারে? ভাবতে লাগলেন?
হঠাৎ লিসা খাটে শোয়া থেকে উঠে বসে রেগে বলল, তুমি আমার সাথে ঘুমাবে না। তুমি সোফায় ঘুমাও?
ড্যনিয়েলও শোয়া থেকে উঠে বসলো বলল, কিন্তু কেন? হঠাৎ তোমার কি হয়েছে?
লিসা আঙুল তুলে বলল, আমার কি হয়েছে? তোমার কি সমস্যা সেটা বলো?
ড্যনিয়েল এর রাগ উঠে গেল। তবুও রাগ কন্ট্রোল করে ঠান্ডা গলায় বলল, আমাদের আদম পরিবার রুলস কি ভুলে গেছো?
লিসা রেগে দাঁতে দাত চেপে বলল, আমি এসব আদম পরিবার ফাকিং নিয়ম কানুন মানি না। এসব মানুষের তৈরি নিয়ম কানুন।
ড্যনিয়েল হতাশ গলায় বলল, হ্যা। এটা সত্য মানুষের তৈরি নিয়ম। তবে কোন জিনিসটা মানুষের তৈরি না সেটা বলো। কোন ধর্ম মানুষের তৈরি না সেটা বলো? আমরা আদম সন্তান। আমরা আদম ধর্ম পালন করি। বাকিরা নিজের ধর্ম চোখ বন্ধ করে পালন করে। কখনও প্রশ্ন করে না কেন প্রার্থনা করবো?
লিসা বলল, বাকিরা না করলে না করুক। আমি করি। কারন আমি বাকিদের মতো না। আমি চাই তুমিও নিজের অন্ধবিশ্বাস ছেড়ে প্রশ্ন করতে শিখো।
ড্যনিয়েল রেগে বলল, অন্ধবিশ্বাস? আমাদের পূর্বপুরুষ এই নিয়ম বানিয়ে গেছে যে ফ্যমিলির মধ্যে বিয়ে করো, বাচ্চা জন্ম দাও। আর দ্বীপে থাকতে তো তুমি কখনও এরকম আরচন করোনি? হঠাৎ তোমার কি হলো।
প্রশ্নটা শুনে নার্ভাস হয়ে যায় লিসা। কারন সে নিজেও জানে না হঠাৎ তার কি হলো।
শান্ত স্বরে লিসা বলে, আমার মুড নাই বাবা। আমি এসব করব না। আমাকে একা ঘুমাতে দাও। তুমি সোফায় ঘুমাও।
ড্যনিয়েলও রাগ নামিয়ে নিচু স্বরে বলে, মুড নেই সেটা আগে বললেই হতো। তাহলে আর এতো কথা বাড়ানো লাগতো না।
একটা বালিশ নিয়ে ড্যনিয়েল সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে লিসা। শুয়ে পড়ে বিছানায়। তবুও কোন এক ভয়ে তার তার ঘুম আসে না। বার বার মনে হতে থাকে ড্যনিয়েল তার ওপর ঝাপিয়ে পড়বে। এই দুশ্চিন্তায় ঘুমাতে পারে না সে।
সকাল ১১টা বাজে। লিসা চার্চে এসেছে যীশু খ্রষ্টের মুর্তির সামনে দাড়িয়ে প্রার্থনা করছে সে।
লিসা দু হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বুকের কাছে রেখেছে। লিসা চোখ বন্ধ করে মনে মনে বলল, হে ইশ্বরপু্ত্র। আমাকে সঠিক পথ দেখাও আমি যে দিশেহারা পথিক। আমার আমার মা নেই, আমার বাবা আমার সাথে শুতে চায়। তুমি কি দেখেও দেখো না। আমাকে সাহায়্য করো। আমেন।
তারপর চোখ খুলে ডানহাত কপালে ছোয়ায়,তারপর বুকের দুপাশে ছোয়ায়। তারপর আঙুলে চুমু খায়।
তখনই তার পাশে দাড়ায় আন্টোনি বলে, প্রার্থনা করছেন? আপনার ইচ্ছা পূরন করুক প্রভু।
লিসা বলে, আমেন। তুমি কি ফ্রি আছো?
ড্যনিয়েল অবাক হয়ে বলে, কেন?
লিসা খুব বিরক্ত হয় মনে মনে। লিসা ভাবে এই ছেলেটা কি আবুল নাকি। বুঝে না কেন? আমি ওকে পছন্দ করি।
লিসা বলে, ক্যফাচিনো খাবো। একা খাবো না। তাই তোমাকে সাথে নিতে চাই।
আন্টোনি বলল, ও আচ্ছা। আমি ফাদার এর থেকে পারমিশন নিয়ে আসি।
লিসা বলে, পারমিশন দরকার নেই।।চলো বেশি সময় লাগবে না।
আন্টোনি বলে, হোলি কাউ৷ কি বলো? পারমিশন ছাড়া যাওয়া যাবে না। একটু অপেক্ষা করো আসছি।
৫মিনিট পর ড্যনিয়েল আসে। আন্টোনি বলে, চলো যাই।
লিসা মুচকি হেসে বলে, পারমিশন দিয়ে দিল?
আন্টোনি বলে, হুম।
তারা দুজন হাটতে থাকে রাস্তায়। লিসার মনে চায় আন্টোনি এর হাত ধরে হাটতে। তবে ভয় পায় সেটা বলতে। যদি ড্যনিয়েল মাইন্ড করে।
লিসা বলে, তোমার কোন গার্লফ্রেন্ড নাই?
আন্টোনি অবাক হয়ে বলে, কি বলো এসব। আমি একজন সাধু হওয়ার জন্য চার্চে এসেছিল। নিজের জীবন মানবতার জন্য উৎসর্গ করেছি। যীশুখ্রীষ্ট যেমন কখনও বিয়ে করেনি। আমিও বিয়ে করতে পারব না।
এটা শুনে লিসা মনটা ভিষন খারাপ হয়।
লিসা বলে, আমি বাসায় চলে যাবো।
আন্টোনি বলে, হঠাৎ কি হলো ক্যপাচিনো খাবেন না?
লিসা মন খারাপ করে বলে, না মুড অফ। বায়। পরে দেখা হবে।
আন্টেনি লিসার মন খারাপ দেখে তারও মন খারাপ হয়।
আন্টোনি বলে, আমার কোন কথায় বা ব্যবহারে কষ্ট পেয়ে থাকলে সরি। আমি আপনাকে বাসায় এগিয়ে দেই।
লিসা বলে, সেটার দরকার নাই। আমি একা যেতে পারব।
তারপর লিসা চলে যেতে থাকে। আন্টোনি দাড়িয়ে থাকে এইতো লিসা হয়তো পেছন ফিরে তাকাবে। তবে লিসা ফিরে তাকায় না।
ঘরে ঢুকলেই লিসা দেখে তার বাবা সোফায় বসে আছে। ভয় পেয়ে যায় লিসা।
ড্যনিয়েল বলে, চার্চে গিয়েছিলে তাই না? তুমি আবার কখন থেকে এসব যীশু কে বিশ্বাস করা শুরু করলে?
লিসা কোন উত্তর দেয় না। তার মনটা আজ ভীষন খারাপ। জানালার কাছে এসে সে নদী দেখতে থাকে।
ড্যনিয়েলও আর বিরক্ত করে না লিসাকে। যেন ড্যনিয়েলও ভেঙে পড়েছে ভেতরে ভেতরে। তবে সেটা প্রকাশ করতে পারে না।
>>><<<<<
সাদিক দুপুররের ভাত খাচ্ছিল আর টিভিতে নিউজ দেখছিল। হঠাৎ নিউজটা শুনে খাবার থামিয়ে টিভিতে মনোযোগ দেয় সে।
মহিলা উপস্থাপিকা বলছে, ময়মনসিংহে একই পরিবার এর ৯জন ট্রেনে সুই***ড করেছে। গ্রামবাড়ি বলেছে তারা নাকি আদম ধর্ম নামে এই বইকে অনুসরন করে শয়তানের পূজো করতো। এবং তাদের কেউই ঘর থেকে তেমন একটা বের হতো না। একই পরিবার এর ৯জন তারা কিভাবে এই শয়তানী কাজে জড়িয়ে পড়লো তা কেউ পড়তে পারে না। ছোট একটা বিজ্ঞপ্তি বিস্তারিত জানতে আমাদের চ্যনেলের সাথেই থাকুন।
সাদিক মনে মনে বলে, ও মাই গড। আদম পরিবার তাহলে ফিরে এসেছে। এটা নিয়ে আমাকে আবার তদন্ত করতে হবে। আগেরবার তো ইউরোপ ফ্যমিলি ছিল। তবে এবার বাংলাদেশের পরিবার এরকম একটা কাজ করলো। ভাবাই যায় না। তার মানে কি? সেই দ্বীপে একজন 'আদম ধর্ম' বইটা পায়। তারপর হয়তো নিজের বাসায় এনে সেটা চর্চা করা শুরু করে দিয়েছিল। তাহলে শেষে সবাই সুই*** করলো কেন? তার মানে এখনও আদম ধর্ম সম্পর্কে আমরা অনেককিছু জানি না। আমার বইতেও তো আমি লিখিনি যে আমি ডেভিডকে পাথর মেরে হত্যা করেছিলাম। আবার সবচেয়ে বড় ভুল করেছি 'আদম ধর্ম' বইটা পুরোটা পরিনি। এখন আফসোস হচ্ছে। এই বই যদি অন্যকোন পরিবার এর হাতে পড়ে তখন? তার আগেই আমাকে এই বইটা খুজতে হবে? জানতে হবে এটার ভেতরে কি এমন রহস্য যা মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
>>>><<<
ড্যনিয়েল বলল, আমাকে একটা বাচ্চা দাও লিসা। তারপর তুমি মুক্ত। তোমার যদি মন চায় এখানে থাকবে না হয় আমার সাথে আমেরিকা চলে যাবে। তোমার ইচ্ছা। এই আদম পরিবার আমাকে টিকিয়ে রাখতে হবে।
জানালার বাইরে নদী দেখছিল লিসা। সেখান থেকে ঘুরে তাকালো তার বাবার দিকে। তিনি সোফায় বসে আছেন।
লিসা অবাক হয়ে বলল, এইটাই? এর বেশি কিছু নয়তো? শুধু একটা বাচ্চা দিলেই আমি মুক্ত হবে?
ড্যনিয়েল দাঁতে দাত চেপে বলল, সেটাই। শুধুমাত্র একটা বাচ্চা চাই তাও তোমার গর্ভ থেকে। তাকে নিয়ে আমি আমেরিকা চলে যাব। সেখানে আদম পরিবার চালু করব। আর তারপর তুমি চাইলে সেই চার্চের ছেলে এন্টোনিকে বিয়ে করতে পারো।
লিসা একটু সন্দেহ হয়। সত্যি ই কি একটা বাচ্চা দেওয়ার পর ড্যনিয়েল তাকে ছেড়ে দিবে? সেটা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছে লিসার। লিসা ভালো করেই জানে তার বাবা মোটেও সরল মানুষ নয়।বরং জটিল মানুষ। এমনও তো হতে পারে বাচ্চা দেওয়ার পর তিনি লিসাকে গলা টিপে হত্যা করতে তারপর পালিয়ে যাবে। লিসা এখন আর তাকে বিশ্বাস করে না।
ড্যনিয়েল বলে, আসো আমার উড়ুতে বসো।
লিসা জানালার কাছ থেকে হেটে তার বাবার কাছে আসে।।তারপর ড্যনিয়েল এর হাটুতে বসে।
ড্যনিয়েল লিসার হাটুতে হাত মালিশ করতে থাকে।
ড্যনিয়েল বলে, ভেরী গুড। আমার আদরের মেয়ে। তোমাকে অনেক ভালোবাসি।
তারপর লিসার ঠোঁটে চুমু খায়। লিসার মন চায় ঠোঁট সড়িয়ে নিতে। তবে মুক্তির আশায় সে বন্দী। তাই ড্যনিয়েল এর যা ইচ্ছা করুক লিসা বাধা দেয় না। ড্যনিয়েল লিসা ঘাড়ে চুৃমু দেয়।তারপর তার জামা খুলে ফেলে।
>>>><<<
রাত ১১টা বাজে। গ্রামের পথদিয়ে বাসায় যাচ্ছে গফুর। গফুর মধ্যবয়স্ক একলোক। যিনি গ্রামে চালের ব্যবসা করেন। খুব হিসেবি মানুষ বলা যায় উনাকে। ১টাকাও কাউকে বাকি দেয় না। উনার ২টা মেয়ে ও একটা ছেলে। ছেলেটা এখন মালয়েশিয়া থাকে। সেখানেই কারেন্টের জব করে। তা নিয়েই গফুরের সংসার।
হঠাৎ গফুর চর্টলাইট মারতেই গাছের কাছে কি একটা পড়ে থাকা বস্তু দেখতে পেল। গফুর একটাই বাজে অভ্যাস। রাস্তায় যা দেখে সেটা তুলে নেয়। একবার ২টাকা পড়ে ছিল। উনি এদিক ওদিক তাকিয়ে তারপর টাকাটা পকেটে ভরে ফেলে। উনার মতে রাস্তায় থাকা টাকা তুললে তেমন পাপ নেই।
আজও গাছের কাছে একটা বস্তু দেখে এগিয়ে যায় গফুর। কাছে আসতেই দেখে একটা বই। বই নিয়ে গফুরের কোন আগ্রহ কখনই নেই। তবে বইটা তাকে আকর্ষণ করছে। কেন সেটা গফুরও জানে না।
গাছের নিচ থেকে বইটা তুলে নেয় গফুর চর্টলাইটটা বগলের নিচে ধরে বইটা পড়তে থাকে।
গফুর বলে, কি বই এইটা 'আদমধর্ম' লেখক গ্রেগর। আবার কিসের চিন্হ কভারে এটা ত্রিভুজ এর চিন্হ কেন?
বইটা খুলে গফুর। চ্যপ্টার ৪ এ আসতেই অবাক হয় ও সন্দেহ করতে থাকে।
গফুর লেখাগুলো পড়ে, তোমরা লুসিফার এর কাছে আত্মা বিক্রি করবা। তাহলে তোমাদের সকল ইচ্ছা পূরন হবে। তোমাদের আত্মা কেনার বিনিময়ে লুসিফার তোমাদের দুনিয়ার সকল সুখ শান্তি ও টাকা পয়সা দিবে।
এমনতিও গফুরের ব্যবসা ভালো যাচ্ছিল না। খালি ঋণ ও কাস্টমার বাকিতে ব্যবসায় মন্দ। তাই শর্টকাটে ধনী হওয়ার লোভ সামলাতে পারে না গফুর। আবারো আশেপাশে তাকায় না এতোরাতে কেউ নাই।
বইটা নিয়ে হাটতে থাকে গফুর বিড়বিড় করে নিজের সাথে কথা বলে।
গফুর বলে, লুসিফার কে চিনি না। আত্মার তো বিক্রি করব বেশি কিছু তো না। আমার দুনিয়াতে টাকা পয়সা হলেই হলো৷ এমনিও অনেক ওঝা দেখছি ওরা কালোযাদুর বই পড়ে। অন্যদের শেখায় না। আজ যেহেতু কালা যাদুর বই পাইসি। তো সত্যমিথ্যা জানি না। তয় ট্রাই কইরা দেখি কি হয়। আর কালো যাদু তো সত্যি ই আসে। একবার আমগো গ্রামের এক লোক মাটির নিচে সোনার কলসি পেল। সে নাকি স্বপ্নে দেখছিল। পরে ওই কলসি বিক্রি কইরা বড়লোক হলো। আল্লায় কারে কেমনে বড়লোক বানায় বলা তো যায় না৷ এই বইটাও হয়তো আমার খারাপ সময়ে আল্লাহ এর থেকেই কোন বার্তা আসছে। বলা তো যায় না।
তখনই আকাশে বিজলি চমকাতে থাকে। বৃষ্টি আসার পূ্র্বাভাস।
গফুর বলে, তাড়াতাড়ি বাসায় যাই। নয়তো বৃষ্টি আইসা উড়ায় দিব।
তখনই হঠাৎ কে যেন গফুর কে পেছন থেকে নাম ধরে ডাকে, গফুর গফুর এই গফুর।
ভয়ে গফুরের ঘাড়ের কাছে কেমন শির শির করতে থাকে। মনে হয় কেউ তার ঘাড় মটকে দিবে পেছনে তাকালে।
তখনই মাটির নিচ থেকে একটা হাত বের হয় আর গফুরের পা ধরে ফেলে। গফুর মাটিতে পড়ে যায়। তার হাত থেকে চর্টলাইট ও বইটা পড়ে যায়। ভয়ে গফুরের কলিজা শুকিয়ে যায়।
গফুর বলে উঠে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। এইটা কি হইতাসে আমার সাথে?
তারপর চর্টলাইট টা তুলে এদিক ওদিক মারে। না কেউ তো নাই। চারিদিকে শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার। তাহলে পা টান দিল কে? গফুর জানে রাত বিরাতে অনেক ঘটনা ঘটে। এসব নিয়ে ভাবতে চান না তিনি। বইটা তুলে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে।যেন ভয় পাচ্ছেন কোন এক অদৃশ্য শক্তি তার কাছ থেকে বইটা ছিনিয়ে নিতে চায়।
রাত ৩টা বাজে। অন্ধকার রুমে বসে আছেন গফুর। একটা চক দিয়ে ত্রিভুজ আকলেন মাটিতে। তারপর ৩কোনায় ৩টা মোমবাতি জ্বালালেন। যেমনটি আদমধর্ম বইতে লেখা আছে। উনি হুবহু সেরকম করতে চান। উনার এক হাতে বই। আরেক হাতে গ্যাসলাইট। মোম এর আলোয় ঘরটা আধো আলো, আধো অন্ধকার হয়ে আছে। ঘরের দরজা ভেতর থেকে লাগিয়ে দিয়েছেন। যাতে তাকে কেউ ডিস্টার্ব না করতে পারে।
গফুর বইয়ের চ্যপ্টার ৫ পড়তে লাগলেন, ত্রিভুজ আকার পর ৩কোনায় ৩টা মোমবাতি জ্বালিয়ে দিবে। তারপর নিচে দেওয়া দোয়াটা পড়তে থাকবে। যতক্ষণ না তোমার শরীর ভারী হয়ে আসে। আর মোমবাতি গুলো নিভে যাবে। নিচের মন্ত্রটা পড়তে থাকো।
" :
הו לוציפר, אני קורא לך. בוא, התגלה לפניי.
উচ্চারণ (লিপ্যন্তর):
Ho Lucifer, ani kore lach. Bo, hit-gala le-fa-nai.
গফুর মন্ত্র পড়তে লাগলো। ৩বার পরার পরও কিছুই হলো না। বিরক্ত হয়ে গেল গফুর।
'দূর ছাই' বলে বইটা ফেলে দিল সাইডে। তারপর উঠে দাড়ালো। মোমবাতিগুলো এখনও জ্বলসে। চলে যেতে থাকলো দরজার কাছে। দরজার কাছে আসতেই হঠাৎ মোমবাতি নিভে পুরো ঘর অন্ধকার হয়ে গেল। বন্ধ ঘরে হঠাৎ একটা বাতাস যেন প্রবেশ করলো। গফুর স্পষ্ট অনুভব করলো তার ঘাড়ের কাছে কিসের যেন ঠান্ডা নিঃশ্বাস। যা যার মনকে ভারী করে দিল। ভয় পাইয়ে দিল। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ তার পেছনের ছায়ামূর্তি বলে উঠলো, তুমি আমায় ডেকেছো। আমি এসেছি।
ভয়ে পেছনে তাকাতে পারছে না গফুর। কোন কথাও বলতে পারছে না। তার শরীর অবশ হয়ে আসছে। অশরীর একটা কিছু তার ঠিক পেছনে। ঘাড় ঘুরালেই হয়তো দেখতে পাবে। তবে ভয়ে তার সেই সুযোগ নেই।
কোনমতে গফুর বলল, আপনি আপনি এসেছেন? আপনি সত্যি এসেছেন।
ছায়ামূর্তিটা হেসে উঠলো। পুরো ঘরময় তার হাসির শব্দ ছড়িয়ে গেল।
হঠাৎ দরজা খুলে গেল। দৌড়ে পালাতে লাগলো গফুর। তার পা গুলো যেন অবশ হয়ে গেছে। দৌড়াতেও পারছে না যেন রাস্তা ফুরাচ্ছে না। গোদামঘর হতে তার নিজের ঘর মাত্র ২মিনিটের পথ। তবে পথ যেন শেষ ই হয় না।
দৌড়ে গিয়ে ঘরের দরজায় থাপ্পড় দিয়ে অজ্ঞান হয়ে যায় গফুর। জ্ঞান ফিরলে দেখে তার মেয়ে নাজমার কোলে শুয়ে আছেন। রহিমা উনাকে হাত পাখা দিয়ে বাতাস করছেন।
নাজমা বলল, বাবা পানি খান।
নাজমা তার বাবাকে পানি খাওয়ায়। মাথায় চুলে হাত বুলিয়ে দেয়।
রহিমা বলল, এতো রাতে আপনি গুদাম ঘরে একা কি করছিলেন? জানেন না? ওই জায়গায়টা ভালো না। নিশ্চই কিছু দেখে ভয় পাইসেন।
গফুর পানি খেয়ে কলিজা ঠান্ডা করে। তারপর বলে, রহিমা তুমি বিশ্বাস করবা না। আমি উনার কন্ঠ শুনেছি। উনি এসেছেন। আমাদের আর কষ্ট করতে হবে?
নাজমা কৌতুহল হয়ে বলল, কে এসেছিল বাবা।
গফুর বিড়বিড় করে বলতে লাগলো, উনি উনি উনি। এসেছিল। আমি কথা বলতে পারিনি ভয়ে।
তারপর ঘুমে চোখ জুড়িয়ে এলো গফুরের। নাজমা নিজের পা সড়িয়ে একটা বালিশ দিয়ে দিল তার বাবার মাথার নিচে।
নাজমা তার মাকে বলে, আম্মা। রাইতে আর উনাকে বিরক্ত করার দরকার নাই। সকাল হইলে জানব কি হইসে? কি দেইখা ভয় পাইসে।
রহিমা বলল, হ। ঘুমা তুইও। আর তোর ছোটবইন দেখ এতোকিছু হইয়া দেখো ওর বাপে মইরা যায়। ওর কোন ঠিকঠিকানা নাই। ঘুমাইতাসে একটু উঠলোও না।
নাজমা বলল, নিজুম তো এমন ই। মাত্র সেভেনে পড়ে। বড় হোক তখন বুদ্ধিশুদ্ধি হবে।
সেই রাতে নাজমা ও রহিমা দুজনের কেউই ঘুমাতে পারলেন না। টিনের চালে কে যেন হেটে হাটছে। এরকম শব্দ আসতে লাগলো। শব্দ কে যেন টিনের ওপর হাটছে। বিড়াল না, বিড়াল হাটতে এতো জোরে শব্দ হয় না।
এমনকি ঘরের মেইন কাঠের দরজাতেও কে যেন থাপ্পড় দেয় একবার। তারপর নাজমা যদি বলে,কে?
কোন শব্দ আসে না বাইরে থেকে। তারপর আবার থাপ্পড়ের শব্দ পায় নাজমা।
নাজমা তার মাকে বলে, শুনলা?
রহিমা বলে, এতো রাইতে কি দেখার দরকার নাই। ঘুমা।
তবে তাদের কারোরই আর ঘুম আসে না।
>>>><<<
আজকে লিসা চোখে আইলাইনার দিয়েছে। একটু সেজে চার্চে যাচ্ছে। যেন এখন আর কোনকিছুই সে পরোয়া করে না। হয়তো ভাঙ্গা মন ঢেকে রাখতেই বাইরে এতো উল্লাস দেখায় সে।
আয়নায় নিজেকে দেখে ঠোঁটে লিপস্টিক দেয় লিসা। লাল রঙের লিপস্টিক তার খুব পছন্দ।তার বাবা ড্যনিয়েল সোফায় বসে পত্রিকা পড়ে আর তার দিকে তাকাচ্ছিল।
ড্যনিয়েল বলল, কোথায়ও যাওয়া হচ্ছে?
লিসা বলল, চার্চে যাচ্ছি।
ড্যনিয়েল বলল, তুমি কি খ্রিস্টান হয়েছো? মনে রেখো আমাদের একটাই ধর্ম। সেটা হচ্ছে আদমধর্ম।
লিসা বলল, জানি। বলতে হবে না।
তারপর ড্যনিয়েল কে পাট্টা না দিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে যায় সে। চার্চে এসে দুহাত মুষ্টি করে প্রার্থনা করে লিসা।
এরকম সময় তাকে দেখে আন্টোনি কথা বলার জন্য এগিয়ে আসে। লিসা খুব বিরক্ত হয়। তবে প্রকাশ করে না।
আন্টোনি বলে,তোমাকে খুব সুন্দর লাগসে আজ।
লিসা ঠোঁট উল্টে বলে, সেই সৌন্দর্য দিয়ে কি করবে? তুমি তো বিয়ে করতে পারবে না।
আন্টোনি মাথা নিচু করে বলে, গতকালের ঘটনার জন্য দুঃখিত আমি। তোমাকে আঘাত করতে চাইনি।
লিসা বলে, সেটা আমার ভালো করেই জানা আছে।
তারপর হাটতে থাকে চার্চ থেকে বেরিয়ে যাবে। তখন পেছন থেকে ডাক দেয় আন্টোনি। থেমে যায় লিসা। তার মনের কোথায় একটা ইচ্ছা নাড়া নেয়। যেন আন্টোনি নিজের মত পাল্টায় সন্নাস জীবন ছেড়ে তাকে বিয়ে করে নেয়।
পেছন ফিরে হাসিমুখে তাকায় লিসা। আন্টেনি বলে, ঠিক মতো বাসায় যেও। বায়।
লিসা মন খারাপ করে বলে, বায়।
আন্টোনি বলে, আমি একটা কথা বলতে চাই।
লিসা আবার আগ্রহী হয়ে উঠে। লিসা ঠোঁটে হাসি রেখে বলে, বলো।
আন্টোনি লজ্জায় লাল হয়ে যায়। তবুও বলতে পারে না মনের কথা।
লিসা বুঝে আন্টোনি তাকে প্রপোজ করবে।
আন্টোনি নিজের চোখ বন্ধ করে বলে, আমি তোমাকে পছন্দ করি। তারপর কোন উত্তর না শুনেই ভয়ে সেখান থেকে দ্রুত পালায়। যেন কোন অপরাধ করে ফেলেছেন।
আন্টোনির লজ্জা ও সংকোচ দেখে দুষ্ট হাসে লিসা। লিসা ভাবে ওর সামনে গেলে আরো লজ্জা পাবে। তাই বাসায় চলে যায়।।
<<<>>>
ময়মনসিংহ যাওয়ার জন্য ট্রেনে উঠেছে সাদিক। ট্রেন চলছে। সাদিক চা খাচ্ছে। হঠাৎ লক্ষ্য করলো পান্জাবি পড়া এক যুবক বার বার তার দিকে তাকাচ্ছে। ব্যপারটা সন্দেহ হলো সাদিকের? প্রথমে সাদিক ভেবেছিল হয়তো তার পাশে জানালা দিয়ে দৃশ্য দেখলে। আসলে না। তাকেই দেখছে। কিন্তু কেন? আর এই পান্জাবি পড়া লোকটাই বা কে?
>>>><<<<
লিসা তার কালো জামা খুলে নগ্ন হয়ে বসে পড়লো ফ্লোরে। ফ্লোরে একটা স্টার চিন্হ আকা হয়েছে। সেই স্টারের ওপর গিয়ে বসলো দু'পা ফাক করে।।যেন আহবান জানাচ্ছে ড্যনিয়েল কে।
পুরো ঘর অন্ধকার ড্যনিয়েল এর হাতে মোমবাতি। ড্যনিয়েল বলে উঠলো, এই মধ্যরাতে তুমি এসে আমার রক্তে মিশে যাও। হে লুসিফার। তোমাকে স্বাগতম জানাচ্ছি। এসো আমার শরীরে মিশে যাও।
হঠাৎ খাটটা কাঁপতে শুরু করলো। ঘরের আলমারিগুলো যেন কোন এক অদৃশ্য শক্তি নাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে ড্যনিয়েল বা লিসা কারো অন্তরে ভয় দেখা গেল না।।যেন তাদের কাছে এসব স্বাভাবিক বিষয়।
লিসা দেখলো তার বাবা ড্যনিয়েল এর চোখ হঠাৎ কালো বর্ন ধারন করেছে। খানিকটা ভয় পেল সে।।তবে বুঝে গেছে এখন ড্যনিয়েল এর শরীরে লুসিফার প্রবেশ করেছে। কেমন হিংস্র হয়ে আছে ড্যনিয়েল যেন কোন সাধারন মানুষ নয়।
ড্যনিয়েল মোমবাতি ফু দিয়ে নিভিয়ে দিল। তারপর এক পা এক পা করে লিসার সামনে যেতে লাগলো। এই অন্ধকারেও লিসা দেখলো ড্যনিয়েল নিজের কালো পোষাক খুলে ফেলেছে। হঠাৎ সবকিছু শান্ত হয়ে গেল। শুধু পুরো ঘরময় লিসার করুন চিৎকার শোনা যেতে লাগলো। যা কেউ শুনলে তার কানের পর্দা ফেটে রক্ত বেরিয়ে আসতো। এবং চিৎকার যা সহ্যের বাইরে।
<<<<>>>>>>
ময়মনসিংহ যাওয়ার জন্য ট্রেনে উঠেছে সাদিক। ট্রেন চলছে। সাদিক চা খাচ্ছে। হঠাৎ লক্ষ্য করলো পান্জাবি পড়া এক যুবক বার বার তার দিকে তাকাচ্ছে। ব্যপারটা সন্দেহ হলো সাদিকের? প্রথমে সাদিক ভেবেছিল হয়তো তার পাশে জানালা দিয়ে দৃশ্য দেখলে। আসলে না। তাকেই দেখছে।
হঠাৎ লোকটা এসে তাকে বলল, আপনি সাদিক তাই না? যে আদম পরিবার বইটা লিখেছেন?
অবাক হয়ে সাদিক বলল, হ্যা। তবে আপনাকে তো চিনতে পারলাম না।
লোকটা বলল, আমি কাজী ম্যাক। ময়মনসিংহ যাচ্ছি ওই যে নিউজ পেয়েছেন একই পরিবার এর ৯জন ট্রেনে আত্ম*** করলো। সেটা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে একটা বই লিখব।
সাদিক খানিকটা ভুরু কুচকালো।
কাজী ম্যাক বলল, আপনার বইটা আমি পড়েছি। আমার একটা প্রশ্ন।
চায়ে চুমুক দিয়ে সাদিক বলল, জি বলুন। আর আপনি দাড়িয়ে আছেন কেন? বসেন।
সরে গিয়ে বসার জায়গা করে দিল সাদিক। ম্যাক বসলেন।
কাজী ম্যাক বললেন, বইতে যা লেখা ছিল সবই কি সত্যি? আর আপনি কিভাবে সেই দ্বীপ থেকে ফিরলেন।
কথাটা শুনে হঠাৎ সাদিকের গলায় চা আটকে মস্তিষ্কে পৌছে গেল। কেশে উঠলো সাদিক। তার হাত থেকে খানিকটা চা পড়ে গেল ট্রেনের বগিতে।
সন্দেহ এর চোখে তাকালেন ম্যাক। বোঝার চেষ্টা করছেন সাদিককে। তবে কিছুই বুঝতে পারলেন না।
সাদিক কথা ঘুরিয়ে বলল, আপনি কি জানেন সেই ৯ জন পরিবার এর থেকে ২জন বেচে গিয়েছিল। পরবর্তী পুলিশ আর তাদের খুঁজে পায়নি।
একটা সিগারেট ধরালেন ম্যাক। তারপর বললেন, হ্যা। জানি। আরো জানি তারা আনোয়ার পীর এর ভক্ত ছিল। যিনি ওই পরিবারকে আদমধর্ম দীক্ষা দেন। আনোয়ার পীরের কাছে অনেকেই এই ধর্মে দীক্ষা নিয়েছিল।
সাদিক অবাক হয়ে বলল, আনোয়ার পীর কে ছিলেন?
ম্যাক বলল, তিনি একজন অতি ধুরন্ধর মানুষ। তিনি বিশ্বাস করতেন মানব জাতি এসেছে আদম নবীর থেকে। সবাই আদমের সন্তান। তাই উনি বলেছেন মুহাম্মদ (স.) কে বাদ দিয়ে আদম নবীকে অনুসরন করতে।
সাদিক বলল, আর তার কথা মেনেও নিল গ্রামের লোকেরা?
ম্যাক বললেন, অনেকে প্রতিবাদ করেছিল। এমনকি একবার চায়ের দোকানে যখন আনোয়ার নিজের মতামত দিত। তখন সেখানের লোকরা মেরে তাড়িয়ে দেন।
সাদিক বলল, ইন্টারেস্টিং ঘটনা। আর কি কি জানেন?
ম্যাক হেসে বলল, সব তথ্য কেন দিব? আমি বই বের করলে আপনি পড়ে নিয়েন। বইয়ের নাম দিব আদম ধর্ম।
সাদিক বলল, ধন্যবাদ। আপনার সাথে কথা বলে ভালো লাগলো।
ম্যাক সাহেবও আন্তরিক ভাবে বললেন, আপনার যাত্রাও শুভ হোক।
সাদিক বলল, যেহেতু এই ময়মনসিংহ এর পরিবার এর ঘটনা আপনি লিখবেন তাই আমি এই বিষয়ে লিখব না। আমি আসলে 'আদমধর্ম' বই যেটা গ্রেগর লিখেছেন। সেটার খোজে যাচ্ছি।
ম্যাক অবাক হয়ে বললেন, এই নামে কোন বই আছে বলে আমার জানা নেই।
সাদিকের ঠোঁটের কোনায় হাসি রেখে বলল, অবশ্যই আছে। শুধু যারা আদম পরিবার তাদের কাছেই এই বইটা থাকে। সবার কাছে না। হয়তো এই বইয়ের একটা কপি ছিল আনোয়ার পীর এর কাছে। বা হয়তো ড্যনিয়েল আনোয়ার পীরের সাথে যোগাযোগ করেছিল। তারপর তাকে এই বইটা দেয়।
ম্যাক বললেন, তাহলে তো দেখছি সবকিছু কানেক্টেড।
সাদিক বলল, আইন্সটাইনও সেটাই বলেছিল, Everything is connected.
<<<>>>
গফুর নিজের চালের দোকান বসে ছিল। গতরাতের ঘটনা এখনও ভুলতে পারেনি। তবে তার মনে সন্দেহ। লুসিফার কি সত্যি ই এসেছিল রাত ৩টায়? নাকি সেসব ভুল ছিল?
দুপুরের ভাত উনি দোকানেই খেলেন। আর গত রাতের ব্যপারে ভাবতে লাগলেন। আফসোস করতে লাগলেন কেন লুসিফার আসলো আর উনি ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল।
আজ তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরলেন গফুর। উনার কাজে মন নেই শুধু 'আদমধর্ম' বইটার প্রতি আগ্রহ হচ্ছিল। গতরাতে সেটা গুদামঘরেই ফেলে রেখেছিল। আর সকালে গুদামঘর তালা মেরে পরিবার এর সবাইকে বলেছিল এই ঘরের আশেপাশেও যেন তারা না যায়।
হঠাৎ গফুরের এরকম আরচনের কারন বুঝতে পারে না তার পরিবার। তবুও তারা গফুরকে প্রশ্ন করতে ভয় পায়।
রাত ১২টায় আবারো গফুর গুদামঘরে আসলো। উনার হাতে একটা চাকু। মাটিতে এখনও ত্রিভুজ চিন্হ আকা। তার ৩কোনায় ৩টা মোমবাতি নেভানো অবস্থায় রয়েছে। একটু দূরেই আদম বইটা পড়ে আছে মাটিতে।
গুদামঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন ভেতর থেকে। তারপর মোমবাতি গুলো ধরালেন তিনি৷ মাটি থেকে আদম বইটা তুলে নিলেন।
ডান হাতে চাকু আরেক হাতে বই। চাকুটা বামহাতের শিরার ওপর ধরলেন৷
তারপর চেচিয়ে বললেন, লুসিফার তুমি যদি সত্যি হয়ে থাকো।।তাহলে দেখা দাও না হয় আমি নিজের হাতের শিরা কেটে ফেলল। নিজেকে ধ্বংস করে দিব।
হঠাৎ একটা বাতাস এসে মোমবাতিগুলো নিভিয়ে দিল। এবারো ভয় পেতে লাগলেন গফুর। চারিদিক অন্ধকার হয়ে আছে। হঠাৎ অনুভব করলেন পেছনে একটা ছায়ামূর্তি দাড়ানো।
গফুরের কপালে ঘাম জমছে। ঢেকুর গিললেন তিনি। তারপর আস্তে আস্তে সাহস করে পেছনে তাকালেন। যা দেখলেন তাহলে রীতিমতো কলিজা শুকিয়ে যাওয়া মতো অবস্থা।
ঘরের এককোয়ায় একটা অন্ধকার মানবমূর্তি দাড়ানো। না পুরো মানব না, মুখটা একটা একটা ছাগলের আর বাকি শরীর মানুষের। এটা কে? এটাই কি তাহলে লুসিফার?
ছায়ামূর্তি নিজের হাত উচু করলো। যেন কিছু একটা চাইছে গফুরের কাছে।
গফুর বুঝলো না ব্যপারটা।
গফুর বললেন, কি লাগবে?
ছায়ামূর্তি বলল, তোমার আত্মা আমার কাছে বিক্রি করো। আমি তোমাকে পৃথিবীর সকল সুখ শান্তি এনে দিব।
গফুর বলল, আত্মা কিভাবে বিক্রি করে আমি জানি না।
লুসিফার বলল, শুধু বলো :
מכרתי את נשמתי ללוציפר. מעתה אני הוורד שלו. אני מחויב לעשות ככל שיצווה עליי. בתמורה, אקבל את כל עושר ואושר העולם הזה, ובחיים הבאים מקומי יהיה לצדו.
উচ্চারণ (লিপ্যন্তর):
Macharti et nishmati le-Lucifer. Me-ata ani ha-vered shelo. Ani mechuyav la'asot ke-chol asher yetzave alai. Bi-tmura, akabel et kol osher ve-osher ha-olam ha-ze, u-va-chayim ha-ba'im mekomi yihiye le-tzido.
গফুর এই মন্ত্রটা পড়ার পরই তার রিদয় হতে একটা গোলাকার আলো বেরিয়ে ছায়ামূর্তির হাতে গিয়ে পড়লো। ছায়ামূর্তি সেই আলোটা ধরে নিজের কাছে রেখে দিল।
তারপর ছায়ামূর্তি টা গফুরের চোখের সামনে উদাও হয়ে গেল। সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেল।
>>>>>>
লিসা বলল, পুরুষ মানুষ শুধু শরীর চায়। সেটা পেয়ে গেলে আর মনের খোঁজ রাখে না।
একটা পাথরের টুকরো সমুদ্রে ছুড়ে মারে এন্টোনি। তারপর লিসার দিকে তাকায়। লিসা একটা বড় পাথরের ওপর কেমন চুপচাপ শান্তভাবে বসে আছে।
এন্টোনি বলে, আমি এরকম নই। আমি তোমার মন চাই।
মুচকি হেসে উঠে লিসা বলে, জানি তুমি বাকিদের মতো না৷ এই জিনিসটাই আমাকে আকর্ষণ করেছিল। মাঝে মাঝে মন চায় আমার ব্যপারে সব গোপন তথ্য তোমাকে বলি। তবে ভয় পাই যদি সম্পর্ক নষ্ট হয়।
এন্টোনি লিসার কাছে এসে হাটুগেড়ে বসে দুহাত চেপে ধরে বলে, থাক। এরকম কিছু বলতে হবে না। যা আমাদের সম্পর্ক নষ্ট করে।
লিসা তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, তুমি কি আমার জন্য এই সাধুর জীবন ছেড়ে সংসারী হতে পারবে?
লিসার হাত ছেড়ে দেয় এন্টোনি। উঠে দাড়ায় এন্টোনি বলে, এটা এতো সহজ না, পুরানো শেকড় ছিড়ে নতুন ভাবে সবাই বাচার স্বপ্ন দেখে। আমার ও ইচ্ছা হয় বিয়ে সংসার। তবে বাস্তবতা তো জানো?
লিসা কৌতুহল নিয়ে বলে, বাস্তবতা কী?
মন খারাপ ভঙ্গিতে পায়ের সাথে পা দিয়ে খেলে এন্টোনি বলে, আমি যদি সাধু জীবন ত্যাগ করি। তাহলে আমাকে শহরের সবার সামনে নগ্ন করে শাস্তি দিবে, পুরো শহর ঘুরাবে আর চাবুকের আঘাত পড়বে আমার পিঠে।
লিসা বলে, এটা আবার কিরকম আইন?
এন্টোনি বলে, আমাদের এখানে এই নিয়ম ই চলে। এর আগে একজন সাধু জীবন ছেড়ে সংসারী হয়েছিল নারীর সঙ্গ চেয়েছিল। তার সাথে একই কাজ করা হয়েছিল। চাবুকের আঘাতে তার পিঠ থেকে রক্তক্ষরণ হয়েছিল পুরো শহর দেখেছিল। তার অপরাধ ছিল একটু ভালোবাসা চাওয়া।
লিসা বলল, ভালোবাসা চাওয়া কোন অপরাধ নয়। যদি অপরাধ হতো তাহলে প্রভু কেন ভালোবাসা তৈরি করলেন আমাদের অন্তরে?
এন্টোনি বলে, সেসব আমি জানি না লিসা। আমাদের অন্তরে শুধু একজনই থাকে সে যিশুখ্রিস্ট।
লিসা উঠে দাড়ায় এন্টোনির গালে হাত রেখে বলে, তাহলে আমরা যদি এই শহর ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাই। যেখানে নতুন পরিচয়ে বাচবো, সুন্দর করে জীবন কাটাবো।
এন্টোনি মুখ ফিরিয়ে মাটি থেকে একটা পাথরের টুকরো তুলে নেয়। তারপর সেটা ছুড়ে মারে সমুদ্রে। কয়েক সেকেন্টের মাঝে সেই পাথরটা ডুবে যায় সমুদ্রের নিচে।
এন্টোনি বলে, শুনতে তো ভালোই লাগে তবে বাস্তবা হচ্ছে আমি শুধু ধর্মের বই পড়েছি। তার বাইরে আমার কাজ সম্পর্কে কোন জ্ঞান নেই।
লিসা আন্টোনিকে পেছন থেকে আলতো জড়িয়ে ধরে বলে, সেটা তুমি ভেবো না। তুমি আমার পাশে থেকো তাহলে হবে।
এন্টোনির হার্টবিট বেড়ে যায়। এই প্রথমবার কোন নারীকে এতো কাছে থেকে ছোয়া। আন্টোনি পেছনে ফিরে তাকায় লিসার দিকে।।দুজনে চোখে চোখ রাখে। যেন সমুদ্রের ঢেউ দেখছে লিসার চোখে, যেন আকাশে শকুনের দলরা থমকে গিয়েছে।
লিসা ঠোঁট এগিয়ে দেয় চুমু খাওয়ার জন্য।
<<<<>>_
গফুর তার চালের দোকানে বসে ভাবছিলেন অন্যমনষ্ক হয়ে। উনার সামনে এক কাপ রংচা রাখা। ব্যবসায় উনার মনোযোগ নেই। দোকানের কর্মচারীরা কাজ করছে। চালের বস্তা বিক্রি করছে এদিক ওদিক করছে। এদিকে তার কোন মনোযোগ নেই। যেন আপন মনে ভেবে চলেছেন গফুর। চা ঠান্ডা হয়ে গেছে তাতে তার কিছু যায় আসে না।
গফুর গালে হাত দিয়ে ভাবলেন, কি ব্যপার। গতরাতে আত্মা বিক্রি করলাম। এখনও কোন ফলাফল পাচ্ছি না কেন? তাহলে কি ওসব আমার চোখের ভুল? তয় আমি তো নিজের চোখে দেখলাম কালা ছায়া। ব্যবসা তো আগের মতোই। কোন উন্নতি তো দেখতাসি না।
হঠাৎ ম্যনেজার এসে দাড়ায় গফুরের সামনে বলে, ২জন লোক আইসে। আপনার লগে কথা বলতে চায়।
গফুর অবাক হয়ে বলে, হঠাৎ এই দুপুরবেলা কে আসলো?
ম্যনেজার বলল, ওরা সাংবাদিক। ঢাকা থেকে আসছেন।
গফুর বলল, সাংবাদিক আমার কাছে কি চায়?
ম্যনেজার বলল, ওইডা জানি না। কথা কন তাইলেই বুঝবেন।
গফুর ইশারা করে বলল তাদের ভেতরে পাঠাতে।
কিছুক্ষণ পর কাজী ম্যাক ও সাদিক এসে হাজির। সাদিক এসেই সালাম দিল গফুরকে। গফুর উত্তর দিতে জানেন। হঠাৎ উনি ভুলে গেলেন সালামের জবাবে কি বলতে হয়। বিষয়টা অদ্ভুত এর আগেও তো মনে ছিল। এখন আবার কি হলো।
গফুর নিজেকে নরমাল রেখে বলল, আপনার চেয়ারে বসেন। ওই ম্যনেজার একটা কোক আর বিস্কুট আনো।
চেয়ার টেনে বসলো সাদিক ও ম্যাক।
গফুর ভদ্রভাবে বললেন, বলেন কি জানতে চান?
সাদিক বলল, আপনি কি একই পরিবার এর ৯জন একত্রে যে সুই*** করলো। এটার ব্যপারে কিছু জানেন?
গফুর বলল, সারাদিন কাজ কামে ব্যস্ত থাকি। এসবের খোঁজ খবর রাখার সময় কই?
সাদিক অবাক হয়ে বলল, কি বলেন? আপনার পাশের এলাকায় এতো বড় একটা ঘটনা হলো অথচ আপনি কিছুই জানেন না?
গফুর বিরক্ত হয়ে বলল, দেখেন। এতো জেনে আমি কি করব? আমি ব্যবসায়ীক সাধারন মানুষ। ব্যবসার হিসাব মিলাইতে যাইয়াই তো হিমশিম খাই। ওইখানে অন্যকিছু কে কি করলো? এসব চিন্তা করা বিলাসিতা।
সাদিকের পাশ থেকে ম্যাক বলে উঠলো, ইন্টারেস্টিং। এরকম মানুষও আছে আমাদের পাশে। আমি আপনার ভক্ত হয়ে গেলাম।
গফুর বলল, কি বুঝলাম না।
তখনই ম্যনেজার কোক ও বিস্কুট দিল টেবিলে।
গফুর বলল, নেন স্যার আপনারা অনেক দূর থেকে আসছেন চা বিস্কুট খান। আপনাদের কি থাকার জায়গা হয়েছে?
সাদিক লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। কারন রাতটা তারা ট্রেনে কাটিয়েছে। তবে আজ রাত কোথায় কাটাবে জানে না। এখানে কোন হোস্টেল ও নাই।
কাজী ম্যাক বলল, থাকার জায়গা আবার কী? যেখানে রাইত সেখানে কাইত। রাস্তায় ঘুমায় পড়বো।
গফুর অন্তত চিন্তিত হয়ে বলল, কি বলেন। রাস্তায় ঘুমাবেন কেন? আ... আমার বাড়িতে কি গেস্ট হিসেবে থাকবেন?
সাদিক ম্যাকের কানে কানে ফিসফিস বলল, উনার বাড়িতে যাওয়া কি ঠিক হবে?? আমরা অপরিচিত মানুষ? উনার বিশ্বাস কি আমরা রাখতে পারব?
ম্যাক সাদিকের কানে ফিসফিস করে বলল,উনি ব্যবসায়িক লোক হয়তো রুম খালি আছে। এখন ভাড়ার কতটা বলে ফেলেন।
সাদিক এতোক্ষণে বুঝতে পারলো যে এটা মেহমান আবদার না, এটা ব্যবসায়ীক আবদার।
সাদিক বলল, ৭দিনের জন্য কত টাকা দিতে হবে?
টেবিল থেকে বিস্কুট মুখে দিলেন গফুর। উনার ঠোঁটের কোনায় হাসি। গফুর মনে মনে বললেন, তাহলে আত্মা বিক্রি কাজে লেগেছে। টাকা আসতে শুরু করেছে। না হলে এতো মানুষ থাকতে এরা কেন আমার কাছে আসলো?
গফুর বলল, আমার যেহেতু টিনেরঘর। তো ৭দিনে ৫০০ করে কত হয়? ৫ সাতে ৩৫শ টাকা। আপনারা ৩হাজার টাকা দিলেই হবে। আর ৩ বেলা খাইবেন। ওইটার হিসাব আলাদা।
সাদিক খানিকা বিরক্ত হয়ে বলল, কত দিতে হবে?
গফুর বলল, আপনারা যেহেতু ২জন। তয় প্রতিদিন ২০০করে ৭দিনে ১৪০০টাকা দিয়েন।
কাজী ম্যাক টেবিলে থাকা কোকের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, ডিল ডান। ঠিক আছে যাওয়ার সময় মোট ৫ হাজার টাকা দিয়ে যাবো। তাহলেই তো হবে?
গফুর ম্যনেজারকে বলল, এই এদেরকে বাড়ি নিয়ে যাও। আর বলো দুপুরের ভাত দিতে। আমাদের গেস্টরুমে থাকতে দাও এদের। এরা দূরের থেকে আসছে।
গফুরের থেকে বিদায় নেওয়ার সময় সাদিক ও ম্যাক হ্যন্ডশেক করলো। তারপর তারা গফুরের বাড়ির দিকে রওনা করলো। আকাশে তখন কড়া রোদ। সূর্যের আলো মুখে পড়ছে সাদিক ও ম্যাকের।
রাতের বেলা হঠাৎ টিনের চালে শব্দে চমকে উঠলো ম্যাক ও সাদিক। কান পেতে শুনলো হ্যা। আবারো শব্দ হলো।
সাদিক বলল, শুনতে পেলেন? সাদের ওপর কে যেন হেটে যাচ্ছে?
ম্যাক নিজেও শুনতে পেয়েছে শব্দটা।
ম্যাক বলে উঠলো, আসলেই তো। এতোরাতে সাদের ওপর কে? আমার খুব কৌতুহল হচ্ছে? একবার বের হয়ে দেখবেন নাকি?
সাদিক বলল, চুপ চুপ চুপ।
ঘরের দরজার সামনে একটা ছায়ামূর্তি দেখতেই দুজনে কৌতুহল হয়ে দরজার দিকে চেয়ে রইলো।
সাদিক বলল, কে? দরজার বাইরে কে?
কোন জবাব আসলো না। এতোরাতে অপরিচিত এই গ্রামে রাতে বের হওয়া উচিত ও নয়। তবে হাত গুটিয়ে বসে থাকাও উচিত নয়।
সাদিক ম্যাককে বলল, চলুন বাইরে গিয়ে দেখি।
ম্যাক বিরক্ত হয়ে বলল, দেখা যাবে বেড়াল। আমি আমার লাইফে অনেক ভুত দেখসি। মানুষই বড় ভুত। তো এসবে আর আগ্রহ পাই না এখন।
সাদিক বলল, তাহলে আপনি ঘুমান। আমি দেখে আসি।
ম্যাক বলল, আপনার ইচ্ছা।
ঘরের দরজা খুলে দিল সাদিক। বাইরে আকাশে চাদ দেখা যাচ্ছে। চাদের আলো উঠানে পড়েছে। উঠানে থাকা চেয়ারটা দেখা যাচ্ছে। আর আমগাছে জোসনা পড়ে রহস্য তৈরি হয়েছে। চারিদিকে আবার ঝিঁঝি পোকার ডাক। এসব গ্রামে না আসলে বোঝাই যায় না।
খাটে শোয়া অবস্থায় ম্যাক বলল, কিছু দেখলেন?
সাদিক হতাশ হয়ে বলল, না।
তখনই সাদিক এর চোখ গেল আমগাছের পেছনে কে যেন দাড়িয়ে তাকে দেখছে। সাদিকের চোখে চোখ পড়লেই বস্তুটা দৌড়ে পালালো। সাদিক বুঝলো না, ওটা কে ছিল? চোর নাকি অন্যকিছু?
তখনই দেখলো গফুরের ছোটমেয়ে নিজুম শাড়ির ঘোমটা মাথায় দিয়ে মুখ লুকিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে সেই আমগাছের দিকে যাচ্ছে। তাকে যাতে দেখা না যায় তাই ঘরের লাইটটা নিভিয়ে দিলেন সাদিক। এখন অন্ধকারে তাকে আর দেখা যাবে না।
সাদিক দেখলো যেই ছেলেটা তাকে দেখে আমগাছ এর পেছন থেকে পালিয়েছিল। সে আবার নিজুমকে দেখে ফিরে এসেছে।
নিজুম আমগাছ এর কাছে যেতেই ছেলেটা তাকে জড়িয়ে ধরলো। নিজুমের বুক টিপে, ঠোঁটে চুমু দিল।
সাদিক বুঝলেন এসব দেখা উচিত না তার তাই দরজা বন্ধকরে দিলেন। তারপর লাইট জালিয়ে খাটে এসে বসলেন।
ম্যাক বলল, কি দেখলেন?
সাদিক বলল, পোলাপাইনদের প্রেম পিরিতি তাও রাইত ২টা বাজে।
হাতে তালি দিয়ে হাসতে লাগলো ম্যাক। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে ঠোঁটে দিয়ে ম্যাক বললেন, তাহলে এতক্ষণ ছাদে হয়তো ওই মেয়ের বয়ফ্রেন্ড ইট মারছিল। এটা হচ্ছে প্রেমের সংকেচ।
সাদিক বলল, হ্যা।।তা তো বুঝলাম। আর আমরা ভেবেছিলাম কোন অশুভ কিছু।
ম্যাক বলল, এসব আদম ধর্ম নিয়ে রিসার্চ করতে করতে আপনার মাথায় শুধু এসবই ঘোরে এখন?
সাদিক বলল, হ্যা।
এদিকে গুদামঘরে গফুরকে দেখা গেল বসে থাকতে। চোখ বন্ধ করে কি যেন বিড়বিড় করছেন।চোখ খুলতেই উনি দেখলেন উনার সামনে সেই ছায়া মূর্তি।
ছায়ামূর্তি বলল, আমায় ডেকেছো? আমি এসেছি।
গফুর এর চোখে লোভ ও ঠোঁটে খুশি দেখা গেল। গফুর মাথা নিচু করে প্রণাম করলো ছায়ামূর্তি কে। ছায়ামূর্তির ঠোঁটের কোনায় হাসির রেখা ফুটে উঠলো।
গফুর বলল, আপনি আমাকে টাকা দিয়েছেন তবে খুব ক্ষুদ্র মাত্র ৫হাজার টাকা। এই টাকায় কি হয়? আমি আত্মা বিক্রি করেছি। আমি আরো বেশি টাকা চাই।
ছায়ামূর্তি বলল, একটা রিচুয়াল করবে? তাহলে তোমাকে ধনী বানিয়ে দিব।
গফুর আগ্রহ নিয়ে জানতে চায়। মোমবাতির আলোয় তার চোখগুলো কেমন চকচক করে উঠে।
গফুর বলে, কি কি কি রিচুয়াল? কি করব?
ছায়ামূর্তি গম্ভীর হয়ে বলে, যখন পূর্ণ চন্দ্রমা হবে। সেই রাতে তোমার প্রিয় মানুষকে কোরবানি করতে হবে। পারবে?
ভয় পেয়ে গেল গফুর। তার প্রিয় মানুষ। সেটা তো শুধুমাত্র তার ছোটমেয়ে নিজুম। বাবা হয়ে কিভাবে নিজের মেয়েকে কোরবানী করবে সে?
ছায়ামূর্তি আবারো বলে উঠে, পারবে তো?
গফুর চোখে সন্দেহ নিয়ে বলল, প্রমান কি এটা করলে আমার সব ইচ্ছা পূরন হবে?
ছায়ামূর্তি শান্তভাবে বলল, ড্যনিয়েল নামে এক শিস্য ছিল আমার খুব ভক্ত। সে তার বড় মেয়ে লুনাকে স্যক্রিফাইস করেছিল। সেদিন রাতে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। আমার জন্য তারা খুব আয়োজন করেছিল দ্বীপে। আমি যখন সেখানে গেলাম। দেখলাম তারা মদ খেয়ে উন্মাদ হয়ে নৃত্য করছে নগ্ন হয়ে। যেন দুনিয়াই তাদের কাছে সব।
আমাকে দেখে একটা শকুর ছিল যেটার শরীরে স্টারচিন্হ। সেি শকুরকে এক কোপে ঘাড় থেকে মাথা ফেলে দিল ড্যনিয়েল।
তারপর মাটিতে একটা স্টার আকা হলো। সেখানে লুনাকে শুয়িয়ে দেওয়া হলো। আমি ড্যনিয়েল এর শরীরে প্রবেশ করলাম। তারপর আমার আর লুনার মিলনমেলা চলবো। ভোর হওয়ার আগে ড্যনিয়েল লুনাকে মেরে ফেলল। তারপর আমি চলে আসলাম। এখন তোমাকে একইভাবে রিচুয়াল করতে হবে।
হঠাৎ ছায়ামূর্তিকে প্রশ্ন করলো গফুর, যদি আমি এসব রিচুয়াল না করি? তাহলে কি হবে?
ছায়ামূর্তি হেসে উঠলো।।সেই হাসিটা ঘরময় ছড়িয়ে গেল।
ছায়ামূর্তি বলল, তাহলে তোমাদের অবস্থাও সেই ৯জন পরিবার এর মতো হবে। যারা ট্রেনে একে অপরের হাত ধরে আত*** করে।
ভয়ে কলিজা শুকিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হলো গফুরের। সে এতোদিন বুঝতে পারেনি। এখন বুঝলো সে কার কাছে আত্মা বিক্রি করেছে।
গফুর বলে উঠলো, এতো কোন ছায়ামূর্তি নয়, এটা এটা ইবলিশ শয়তান।
ছায়ামূর্তি বলল, একেকমানুষ আমায় একেক নামে ডাকে।
কথাটা বলে ছায়ামূর্তি হেসে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। তবে তার হাসি পুরো ঘরময় ছড়িয়ে গেল।
গফুর তার মেয়ে নিজুম এর চুলের মুঠি ধরে উঠানে নিয়ে আসলো। নিজুম তার বাবার পা ধরে কান্নাকাটি করছে।
নিজুম বলছে, বাবা আমাকে মাফ করে দাও। আমার ভুল হয়ে গেছে।
দরজায় দাড়িয়ে আছে নিজুমের মা ও বড়বোন। অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। কিছু করতে পারছে না। গফুর এর চোখের কোনায় জল। গফুর বিড়বিড় করে গালের মতো বলছে, তোমাকে বলি না দিলে সেই ছায়ামূর্তি আমাদের পুরো পরিবারকে খতম করে দিবে। পুরো পরিবারকে বাচাতে হলেও তোমাকে সেক্রিফাইস করতে হবে।
নিজুম তার বাবার পা ধরে বলছে, বাবা আমি আর ওই ছেলের সাথে দেখা করব না। অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি।
বাইরের চিল্লাচিল্লিতে ঘুম ভেঙ্গে যায় ম্যাক ও সাদিকের।
সাদিক বলে, চলেন তো ভাই দেখি কি হচ্ছে।
ম্যাক বলে, হ্যা। এখন যাওয়া উচিত।
তারা ঘরের বাইরে এসে এসে উঠানে নিজুম বসে কাদছে। আকাশের চাদ পূর্ণ রুপে ধারন করছে। যেন সূর্যের আলোয় নিজেকে আলোকিত করেছে।
সাদিক দেখলো গফুর রান্নাঘর থেকে মাংস কাটার চাপাতি নিয়ে বের হয়েছেন। দরজায় দাড়িয়ে আছে তার বউ ও মেয়ে। এরা কেন প্রতিবাদ করছে না?
সাদিক ম্যাককে বলল, আমাদের কি গফুরকে আটকানো দরকার?
সাদিক পাশে তাকিয়ে দেখলো ম্যাক নাই। ম্যাক আলরেডি দৌড়ে গেল গফুরকে আটকাতে। গফুর লুঙ্গিটা শক্ত করে বাধলেন।
ম্যাক গফুর এর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
ম্যাক দেখলেন গফুর এর চোখ কেমন কালো হয়ে গেছে।
ম্যাক বলল, আপনি এরকম পাগলামি করছেন কেন?
গফুর দাঁতে দাত চেপে বলল, সরে যাও। আমার কাজে বাধা দিও না।
ম্যাক বলল, কি করবেন আপনি?
তারপর ম্যাক সাহস করে গফুরের হাত থেকে চাপাতি ছিনিয়ে নিতে গেল। গফুর ম্যাককে এক হাতে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর এগোতে লাগলো নিজুমের দিকে। সাদিক দাড়িয়ে সব দেখছে। কি করবে বুঝতে পারলো না।
ম্যাক আবার উঠে দাঁড়ালো। পেছন থেকে গফুরের হাত ধরে ফেলল। গফুর রেগে এবার ম্যাক এর কাঁধে একটা কোপ মেরে বসলো। ম্যাক এটা কল্পনাও করেনি গফুর তাকে আক্রমণ করবে। ব্যথায় কুকড়ে উঠলো ম্যাক। উনার কাঁধ বেয়ে রক্ত পড়তে লাগলো। যেন হাতটি অবশ হয়ে যাচ্ছে। শরীরে আর শক্তি পাচ্ছেন না। উনি মাটিতে শুয়ে পড়লেন।।চোখে সবকিছু ঝাপছা দেখতে লাগলেন।
সাদিক নিজুমের সামনে গিয়ে দেয়ালের মতো দাঁড়ালো। তার সামনে আসলো গফুর হাতে চা-পাতি।
এসেই সাদিকের গলা চেপে এক হাত দিয়ে শূন্যে তুলে ছুড়ে মারলো আমগাছটার ওপর। সাদিক আমগাছে ধাক্কা লেগে পিঠে ব্যথা পেল। দাড়াতে গিয়েও পারলো না, ব্যথায় পুরো শরীর ঝিমঝিম হয়ে এলো। জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলতে লাগলো সে। এখন দেখা ছাড়া আর কি ই বা করার আছে তার?
নিজুম দেখলো তার বাবা দাড়িয়ে আছে দু'হাত দিয়ে চাপাতি ধরে আছে। গফুর বিড়বিড় করে বলল,
הקדשתי אותך לשטן.
উচ্চারণ (লিপ্যন্তর):
Hikdashti otcha la-Satan.
তারপর এক কোপে নিজুমের ঘাড় থেকে মাথা আলাদা করে দিলেন। দরজার সামনে এই দৃশ্য দেখে শাড়ির আচলে মুখ লুকিয়ে কাদতে লাগলেন রহিমা বেগম। নাজিমাও তার মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। সাদিক অবাক হয়ে রইলো তার মাথা এলোমেলো হয়ে গেল। ভেতরে বলে উঠলো একটা বাবা তার মেয়েকে কিভাবে খুন করতে পারে?
খুন করার পর গফুর ধপাস করে মাটিতে বসে পড়লো। তার হাত কাঁপতে কাঁপতে হাতের থেকে রক্তমাখা চাপাতি মাটিতে পড়ে গেল। কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন তিনি।।এই মেয়েকে অনেক ভালোবাসতেন। আজ সেই মেয়েকে নিজ হাতে খুন করলেন। মাথা বিহীন নিজুম এর দেহটা বুকে জড়িয়ে ধরে কাদতে লাগলেন গফুর। তবে এখন যে আর তার কোনকিছুই করার নেই। কারন অনেক দেরী হয়ে গেছে।
সাদিক দেখলো টিনের চালে একটা কাক আকাশে উঠে গেল। আকাশে কালো মেঘরা চাঁদ কে ঢেকে ফেলেছে। চারিদিকে কেমন অন্ধকার নেমে আসলো।
<<<>_>__>>>
এদিকে রাতে ড্যনিয়েল অপেক্ষা করছে লিসার জন্য। লিসা এখনও বাড়ি ফিরছে না।
হঠাৎ দরজার নক হতেই ড্যনিয়েল খুলে দিল। লিসা দাড়িয়ে আছে বাইরে।
ড্যনিয়েল বলল, এতো রাত করে বাড়ি ফেরা? এটা তো উচিত না? আমি তোমার জন্য চিন্তা করছিলাম।
লিসা ঠোঁট উল্টে বলল, হুম। তোমার আমাকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। এখন আমি বড় হয়েছি। নিজের মতো চলতে পারি।
লিসা ঘরের ভেতর প্রবেশ করলো। ড্যনিয়েল লিসার দু হাত শক্ত করে চাপ দিয়ে বলল, তা অবশ্য ঠিক। তোমার স্বাধীনতা আছে।
লিসা বিরক্ত হয়ে বলল, ছাড়ো। আমি ব্যথা পাচ্ছি।
ড্যনিয়েল লিসাকে ছেড়ে অস্থির হয়ে সোফায় বসে পড়লেন। কি যেন ভাবতে লাগলেন।
লিসা জুতা খুলে ঘরে প্রবেশ করবে। তখন ড্যনিয়েল বলল, আমাদের কথা বলা উচিত।
লিসা পেছন ফিরে চেয়ে বলল, সকালে কথা বলতে পারব আমরা।
ড্যনিয়েল বলল, তখন হয়তো আমার সময় থাকবে না। আমি এখন কথা বলতে চাই তুমি আমার সামনের সোফায় বসো।
লিসার কোন ইচ্ছা ছিল না। তবুও সোফায় বসলো।
ড্যনিয়েল বলল, আমি জানি তুমি আর এন্টোনি রিলেশনে আছো। তবে তুমি কি জানো না তার জীবন আলাদা? তোমাদের রিলেশন মানুষ জানলে তাকে চাবুক মেরে ঘোরাবে শহরে? তুমি কি জেনে বুঝে ছেলেটার জীবন বিপদে ফেলছো?
লিসা শান্ত স্বরে বলল, আসল ব্যপার এটা না যে ছেলেটা বিপদে পড়বে।।আসল ব্যপার এটা যে তুমি জেলাস হচ্ছো? আম্মু যখন প্রেম করেছিল এ্যরন এর সাথে তখনও তুমি জেলাস হয়েছিলে। তুমি আসলে জেলাস ছাড়া কিছুই হতে পারো না। আর তোমার শুধু শরীর চাই আমাকে না।
ড্যনিয়েল রাগ কন্টোল করে বলে, আমরা তাদের জন্যই জেলাস হই। যাদেরকে আমরা ভালোবাসি।
লিসা খোচা মেরে বলে, ভালোবাসা? তুমি নিজ হাতে আম্মুকে খুন করেছো? আবার ভালোবাসার কথা বলসো?
ড্যনিয়েল এর চোখে ভেসে উঠে সেদিনের ঘটনা। ড্যনিয়েল বলে, সেটা একটা ভুল বুঝাবুঝি এক্সিডেন্ট ছিল। আমি ভেবেছিলাম সেটা এ্যরন।
লিসা আবারো খোঁচা দিয়ে বলে, যে নিজের বউকে চিন্তে পারে না। সে আবার আমাকে চিনবে?
ড্যনিয়েল জোরে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলে, সেদিন এর ঘটনার জন্য আমি এখনও অনুতপ্ত। আমি আসলে ভুল করেছি সেটা আমি জানি। এই ঘটনা আমাকে রাতে ঘুমাতে দেয় না।
লিসা আঙুল তুলে চোখে চোখ রেখে বলে, অনুতপ্ত আর তুমি? তুমি একটা মনস্টার। মনস্টার রা কখনও অনুতপ্ত হয় না।
হঠাৎ লিসা দেখে ড্যনিয়েল এর চোখগুলো কালো বর্ন ধারন করেছে। গলার স্বর পাল্টে গেছে ড্যনিয়েল এর।
ড্যনিয়েল বলল, হ্যা। আমি হয়তো মনস্টার। কারন দুনিয়া সহজ সরল বোকা মানুষদের জন্য না। আমরা সিস্টেম মানি না। আমরা নিজেরা সিস্টেম তৈরি করি।
লিসা একটু ভয় পেয়ে গেল। তার বাবার এই রুপ দেখে।
তবুও বলে, আর তোমার এই সিস্টেম আমি মানি না।
হঠাৎ একটা জাটকা লাগলো ড্যনিয়েল এর তার চোখ আগেট অবস্থায় ফিরে এলো।। এবার স্বাভাবিক গলায় বলল, ঠিক আছে। রাত হয়েছে। ঘুমিয়ে পড়ো। শুভ রাত্রি।
লিসা বলল, গুড নাইট পাপা।
তারপর ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লো।
এদিকে সোফায় বসে বিড়বিড় করতে লাগলো ড্যনিয়েল। তিনি বললেন, ও আমার মেয়ে। এটা আমি করতে পারি না।
তার ভেতরে কেউ গম্ভীর গলায় বলল, তোমাকে এটা করতেই হবে। এটা আমার আদেশ।
ড্যনিয়েল বলল, আমি মনস্টার হতে চাই না।
তার ভেতর থেকে গম্ভীর গলায় শব্দ এলো, ভালো মানুষেরা সব নরকে চলে গেছে। সব মনস্টার পৃথিবীতে এসে পড়েছে। এখানে সবাই মনস্টার।
ভোরের আলো ফুটে উঠেছে আকাশে। নিজুম এর গলাকাটা দেহ পড়ে আছে উঠানে। গফুর পালিয়েছে কোথায় পালিয়েছে কেউ জানে না। পুলিশকে খবর দেওয়া হয়েছে তারা আসছেন।
শরীরে ব্যথা নিয়ে উঠে দাড়ায় সাদিক। পিঠে হাত দিয়ে দেখে রক্ত জমাট বেধে আছে। পিঠ ফুলে উচু হয়ে আছে। সেখানে টিপ দিতেই ব্যথায় কুকিয়ে উঠে সে। একবার ম্যাক এর কাছে আসে।
সাদিক দেখে ম্যাক শুয়ে আছে উঠানে। সাদিক বলল, ভাই। উঠেন। ফ্রেশ হয়ে নেন।
ম্যাক কোন জবাব দিল না। দরজার কাছে এখনও দাড়িয়ে আছে রহিমা ও তার বড় মেয়ে। তারা ভয়ে নিজুমের লাশের কাছে আসছে না। টিনের চালে কাকের দলেরা চেচিয়ে চলেছে।
হাত দিয়ে পায়ে ভর করে চলে সাদিক। চাপকলে এসে হাত মুখ ধোয়। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে বসে উঠানে। রহিমা বেগমকে ইশারায় বলে, নিজুমের দেহ এর ওপর সাদা চাদর দিয়ে ঢেকে দিতে। রহিমা ঘরের থেকে সাদা চাদর এনে নিজুমের দেহ ঢেকে দেয়।
আস্তে আস্তে গ্রামের লোকেরা সেখানে জড়ো হয়ে কানে ফিসফিস করে কথা বলতে থাকে একে অপরের সাথে। সকাল ১০টায় পুলিশের গাড়ি আসে উঠানে। সেখান থেকে পুলিশরা নামে। ঘটনা বোঝার চেষ্টা করে। ৪জন পুলিশ চাদর উঠিয়ে নিজুমের দেহ দেখে। তখন গ্রামের লোকেরাও উকি দিয়ে দেখতে থাকে। কি হলো?
এসিপি মন্জু সাদিককে বলে, আপনার সাথে আমার পার্সোনাল কথা আছে। ঘরে চলেন।
তারা একটি খালি রুমে আসে। মন্জু কাধে হাত দিয়ে চলতে হচ্ছিল সাদিককে। তাই একটু লজ্জাও পায় সে।
সাদিক খাটে হেলান দিয়ে বসে। তার সামনে মন্জু বসা।
মন্জু বললেন, আপনার পরিচয় দেন। আর সব সত্য কথা বলবেন। কেন এই গ্রামে এসেছেন? আর গফুরের সাথে আপনার সম্পর্ক কি? আর গতরাতে কি হয়েছিল?
>>>>>><<<<<<<
আজ নৌকা করে ঘুরতে বেরিয়েছে আন্টোনি ও লিসা। আন্টোনির বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে সে।
লিসা আন্টোনির বুকে হাত রেখে বলল, আমার এই জীবন আর ভালোলাগে না। অতিষ্ঠ হয়ে গেছি। তোমাকে বললাম চলো নতুন জীবন শুরু করি। তুমি পাট্টাই দিচ্ছো না আমাকে।
আন্টোনি লিসার হাত ধরে চুমু খেয়ে বলে, তোমার ব্যপারটা আমি ভেবেছি। গতকাল সারারাত ঘুমাতে পারিনি। দেখো ছোটবেলা থেকে আমার বাবা মা নাই। এই চার্চে বড় হয়েছি। তাই মায়া জন্মে গেছে।
লিসা বলল, আর আমার জন্য তোমার কোন মায়া জন্মায়নি?
আন্টোনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, দেখো লিসা। আমি জানি না তুমি আমাকে কেন ভালোবাসো? আর কেন আমাকে নিয়ে আজীবন থাকতে চাও? আমি কি সত্যি ই তোমার ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য?
লিসা বিরক্ত হয়ে বলে, তুমি কথা ঘুরাচ্ছো। আমার প্রশ্নের উত্তর দাও? তুমি কি আমার সাথে পালাতে রাজি? তাহলে নৌকা কে বলো জাহাজে উঠিয়ে দিতে।।আমরা এই দেশ ছেড়ে চলে যাব।
আন্টোনি অবাক হয়ে বলে, কি বলো? এতো তাড়াহুড়ো এখন?
লিসা বলে, হ্যা। এখনই। আর মোটেও তাড়াহুড়ো না।।এই নিয়ে আমাদের অনেক আগে থেকেই প্লান ছিল।
আন্টোনি বলে, যাওয়ার আগে তো বিদায় নিতে হয়।
লিসা বলল, আমি কারো কাছে বিদায় চাই না।
আন্টোনি বলল, তবে আমি চাই। ফাদারের কাছে বিদায় নিতে হবে। জামাকাপড় ব্যগে ভরে আনতে হবে।
লিসা বলল, এগুলো আসলেই ইম্পর্ট্যান্ট। জামা কাপড় তুমি পড়েও কিনতে পারবে। আর ফাদার জানলে তোমাকে কখনই আমার সাথে আসতে দিবে না। তুমি হয়তো আজ আমার সাথে জাহাজে চলো। নয়তো আমাকে ভুলে যাও।
বিপদে পড়ে গেল এন্টোনি। কি করবে বুঝতে পারছে না। সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। একদিকে তার ধর্মীও জীবন। আরেকদিকে অপরুপ সুন্দর নারী তাকে আহ্বান করছে। যার আকর্ষণ এতো তীব্র যে চাইলেই মুখ ফেরানো যায় না।
আন্টোনি বলল, তোমার বাবার একবার ভাবো।তার কি হবে?
লিসা বলল, আমি আমার বাবাকে ঘৃনা করি।
আন্টোনি অবাক হয়ে সরু চোখে তাকায়।
আন্টোনি বলে, ঠিক আছে তোমাদের মাঝে হয়তো সম্পর্ক ভালো না। সেটা তোমাদের ব্যক্তিগত ব্যপার। আমি এই বিষয়ে নাক গলাবো না। মাঝি আমাদের জাহাজের কাছে নিয়ে চলো।
মাঝি মাথা নেড়ে হ্যা বললো। তাদের নৌকা জাহাজের কাছে যেতে লাগলো। আর আন্টোনির বুক ধ্বুক ধ্বুক করতে লাগলো ভয়ে। সে জানে না আগামীর দিনগুলো কেমন হবে? ভালো না খারাপ। দুটোই হতে পারে। সবভুলে আন্টোনি লিসাকে বুকে টেনে কপালে আলতো করে চুমু খায়। যেন তার কাছে বর্তমানই সব। অতীত ভবিষ্যত এখন আর ম্যটার করে না। আন্টোনি নিজের গলায় থাকা 'ক্রস' যিশুখ্রিস্টের চেইনটা খুলে নদীতে ফেলে দেয়। এখন থেকে তার নতুন জীবন শুরু হবে।
<<<>>>>>
এদিকে সাদিক পুলিশ মন্জকে গতরাতের ঘটনা খুলে বলে।
সবশুনে মন্জু বলে, এই কাজী ম্যাকটা কে? তার পরিচয় কি? পরিবার কে? আর এই লোকটা যে মারা গেল। তার পরিবারকে তো জানাতে হবে তাই না?
সাদিক মাথা নিচু করে রাখে কোন উত্তর দেয় না।
মন্জু বলল, আপনি তো পত্রিকায় লেখালেখি করেন। এই যে ঘটনা হলো এসব নিয়েও লিখবেন। জানি তবে শুধু টাকার জন্য বানিয়ে অনেক সত্য/মিথ্যাও লিখবেন।।কারন আপনারা ভাইরাল নিউজ পছন্দ করেন।
রাগ উঠে গেল সাদিকের নিজেকে শান্ত করতে একটা সিগারেট ধরালো সে। সিগারেট টান দিল।
মন্জু বলল, কিছু মনে করবেন না একবার এক সাংবাদিক আমার নামে পত্রিকায় মিথ্যা খবর ছাপায়। আমি নাকি আনোয়ার পীর এর ভক্ত তার পা চাটি। তবে তার কাছে কোন প্রমান ছিল না। তার আর কি? তার হাত কেটে ফেলি।
সাদিক বুঝলো মন্জু হয়তো সত্য বলছে বা তাকে ভয় দেখাতে চাইছে। সাদিক বুদ্ধিমান তাই ভয় পেলেও বাইরে শান্ত রইলো।
মন্জু বলল, দেখুন সাদিক আপনি হয়তো ঢাকা চলে যাবেন। এই বিষয়ে বই লিখবেন, পত্রিকায় লিখবেন। মানুষ সেগুলো পড়বে আর আশ্চর্য হবে। তবে আপনি কি কখনও ভেবে দেখেছেন যে সাংবাদিকদের কলমে সবসময় একটু মিথ্যে থাকে? না ভেবে থাকলে অবশ্যই ভাববেন। আর কিছু মনে করবেন না আমি একটু বেশি কথা বলি। এটা আমার মূদ্রাদোষ। পেটের কথা চেপে রাখতে পারি না।
দরজার সামনে এক পুলিশ এসে বলল, স্যার। আমাদের যেতে হবে।
মন্জু দরজায় তাকিয়ে বলল, লাশগুলো কি এম্বুলেন্স উঠানে হয়েছে?
পুলিশ বলল, হ্যা। স্যার।
মন্জু সাদিকের দিকে তাকিয়ে বলল, আসি তাহলে ভালো থাকবেন।
সাদিক বলল, আপনি খুব ভালো করেই জানেন। আমি ঢাকা যাব না। আমি জানি গফুর হয়তো রাতেই তার পরিবার এর সাথে দেখা করতে আসবে। তাই আমি কিছুদিন এখানে থাকব।
অবাক হয়ে যায় মন্জু সাদিকের বুদ্ধি শুনে।
মন্জু তাড়াতাড়ি তার পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে দেয় সাদিকের হাতে বলে, তখন আমাকে কল দিয়েন। আমরা এসে তাকে ধরে ফেলব।
চুপ করে থাকে সাদিক কোন উত্তর দেয় না।
পিঠে ব্যথা নিয়ে সাদিক ঘরের বাইরে এসে দাড়ায়। উঠান পুরো খালি সিগারেটে ফু দিয়ে ধোয়া ছাড়ে সে। মন্জু পুলিশের গাড়িতে উঠে হাসিমুখে একটা স্মাইল করলো সাদিকের দিকে। সাদিক হাত তুলে বিদায় জানালো মন্জুকে। তাদের গাড়ি ছেড়ে দিল।
তখনই সাদিকের চোখ পড়লো গোডাউন ঘরের দরজার দিকে। সেই দরজা খোলা ভেতরে একটা বই দেখা যাচ্ছে। সাদিকের সন্দেহ হলো তাই এগিয়ে গেল সেখানে।
গোডাউন ঘরে ঢুকে সাদিক দেখলো একটা ত্রিভুজ আকানো মাটিতে তার ৩কোনায় ৩টা মোমবাতি। আর তার মাঝখানে সেই গ্রেগর এর লেখা 'আদমধর্ম' বইটা। আশেপাশে তাকিয়ে সাদিক সেই 'আদমধর্ম' বইটা তুলে নিল। যাতে কেউ না দেখে। তারপর জামার ভেতর ঢুকিয়ে পেটের সামনে রাখলো।।শার্ট দিয়ে বইটা ঢেকে রাখলো। যাতে বাইরে বের হলে বইটা দেখা না যায়। আর সাদিক বুঝে গেল গফুর 'আদমধর্ম' পালন করেই তার মেয়েকে হত্যা করেছিল।
সাদিক সব ডট মেলানোর চেষ্টা করলো, সেই দ্বীপটা যেখানে ড্যনিয়েল পরিবার থাকতো। এখান থেকে ২কিলোমিটার দূরে। সেখান থেকে হয়তো ৯জন যারা ট্রেনে 'আত্ম***' করেছিল। তারা এই বইটা পায়। তারপর হয়তো কোনভাবে বইটা গফুর পায়। যেহেতু তারা একই এলাকার ছিল। আর এখন বইটা সাদিকের হাতে।
তবে সাদিকের ধারনারও বাইরে যে বইটা কতটা অভিশপ্ত ।
>_>><<<<
আন্টোনি ও লিসা তখন জাহাজে উঠলো। তবে জাহাজ এখনও রওনা হচ্ছে না। হঠাৎ লিসা দেখলো জাহাজে থাকা কালো কাপড় পরা কিছুলোক তাদের দিকে বার বার ঘুরে তাকাচ্ছিল। লিসা ভয় পেয়ে আন্টোনির পেছনে লুকায়।
লিসা ও আন্টোনি জাহাজের ২য় তলায় আসে। তখনই কালো কাপড় পড়া লোকগুলো তাদের ধরে ফেলে তাদের ২জনের মুখে কালো কাপড় পড়িয়ে দেয়। আর তাদের হাত বেধে ফেলে।এরা কে বা কারা সে সম্পর্কে লিসা কিছুই জানে না।
ড্যনিয়েলকে বাসা থেকে খবর দিয়ে চার্চে আনা হয়েছে। কেন সেটা ড্যনিয়েল সেটা এখনও জানে না।
চার্চে ঢুকলেন তিনি। দেখলেন ফাদার বাইবেল পড়ে শোনাচ্ছেন আর চেয়ারে থাকা সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে। ড্যনিয়েলও একটা খালি চেয়ারে বসে পড়লেন৷ তারপর ফাদার তাকে দেখে বাইবেল পাঠ বন্ধ করলেন। আর সবাইকে বিদায় জানালেন। তারপর ড্যনিয়েলকে ইশারায় কাছে ডাকলেন। সবাই চার্চ ছেড়ে যাচ্ছে।
ফাদার ড্যনিয়েলকে একটি কক্ষে নিয়ে গেলেন৷ সেখানে কেউ ছিল না।
ফাদার বললেন, তোমার মেয়ে লিসা কি করেছে? জানো? আন্টোনির সাথে পালাচ্ছিল জাহাজে আমার লোকেরা তাদের হাতে নাতে ধরেছে।
কি একটা চিন্তা করে ড্যনিয়েল বলল, পালাচ্ছি কেন বলছেন? হয়তো ওরা ওখানে ঘুরতে গুয়েছিল?
ফাদার বলল, আন্টোনির গলায় সেই চেইনটা আর নেই। তুমি বুঝতে পারছো? আর একটা সাধু কখনই নারীসঙ্গ ভোগ করতে পারবে না।
ড্যনিয়েল শান্ত স্বরে বলল, ঠিক আছে। আপনি যা ভালো মনে করেন। শুধু আমার মেয়েকে ছেড়ে দেন। আমরা কথা দিচ্ছি এই দেশ ছেড়ে চলে যাবো। আমেরিকা চলে যাবো।
ফাদার বলল, এক হাতে তালি বাজে না। তোমার মেয়েই হয়তো ওকে আকর্ষণ করেছে এসবের জন্য। না হলে ওর মতো একটা ছেলে এর আগে কারো দিকে চোখ তুলেও তাকায়নি৷ সে প্রেম করবে ভাবা যায় না।
দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে ড্যনিয়েল বলল, সব দোষ নারীর। এটা তো অতীতের কথা। পুরুষরাও দোষ করতে পারে।
ফাদার তীক্ষ্ণ চোখে বললেন, তুমি তোমার মেয়ের সাপোর্ট টানছো।
ড্যনিয়েল বলল, হ্যা। হয়তো। আমার জায়গায় থাকলে আপনি কি করতেন? হাত গুটিয়ে বসে থাকতেন?
ফাদার বললেন, ওদের কে শাস্তি দেওয়ার পর। তুমি তোমার মেয়েকে নিয়ে যেতে পারো?
ড্যনিয়েল রেগে বলল, কিসের শাস্তি? কোথায় লেখা আছে যে যিশুখ্রিস্ট বলেছে প্রেম করলে তোমরা ধরে শাস্তি দাও। আইন নিজের হাতে তুলে নাও।
ফাদার বললেন, শান্ত হও ড্যনিয়েল। তুমি ইশ্বরের অপমান করছো।
ড্যনিয়েল দাতে দাঁত চেপে বলে, আমি ইশ্বরের অপমান করছি না। তোমরা করছো প্রেম যদি খারাপ হতো। তাহলে ইশ্বর কেন এই প্রেম তৈরি করলো? মূলত ইশ্বর নিজেই খারাপ।
ফাদার রেগে বলল, তুমি লুসিফার এর মতো কথা বলসো। ইশ্বরকে অমান্য করছো।
ড্যনিয়েল বলল, হ্যা। আমি লুসিফার এর মতো কথা বলছি। কারন সে ছিল যুক্তিবাদী ও প্রশ্নের রাজা। তোমার ইশ্বর কখনও তার সাথে যুক্তিতে পারেনি। তাই তাকে স্বর্গ থেকে বহিষ্কার করেছিল।
ফাদার বলল, মন চাইছে তোমার গলা কেটে ফেলি। তবে আমি তা করব না।।ইশ্বর দয়াবান। আমি তোমাকে ক্ষমা করলাম।
ড্যনিয়ল বলল, তবে আমি আপনাকে ক্ষমা করিনি। আমি কালো যাদু করে আপনাকে মেরে ফেলব। আমার মেয়েকে না পেলে, এখান থেকে যাওয়ার পরই আপনাকে মেরে ফেলব।
ফাদার এর চোখে ভয় বা সন্দেহ দেখা দিল। তিনি এতোক্ষণে বুঝলেন ড্যনিয়েল মোটেও সাধারন কেউ না।
<<<>>_
গফুর একটি টার্নেল এর ভেতর লুকিয়ে আছে। এখানে পানি টপটপ পড়ার শব্দ হচ্ছে। অন্ধকারে ইদুরের কিচিরমিচির ও শুনতে পেলেন। এতো অন্ধকার যে দিনের বেলাও আলো আসে না। উনার টার্নেল এর ওপর দিয়ে একটা ট্রেন গেল। ট্রেনে শব্দে গফুর বুঝলো এখন সন্ধা ৭টা বাজে। এই সময় রাতের ট্রেন ছাড়া হয় ঢাকার উদ্দেশ্যে।
হঠাৎ গফুর দেখলো টার্নেল এর মাথায় ২জন লোক এর ছায়া দেখা যাচ্ছে। তারা চর্ট মেরে কথা বলতে বলতে ভেতরে আসছে। হাত দিয়ে চেহারা ঢেকে মুখ লুকিয়ে বসে রইলো গফুর। তাদের একজন গফুরকে চর্টলাইট মারতেই ভয়ে বলল, কে ওখানে।
গফুর কোন জবাব দিল না।
তারা আবার বলল, কে আপনি? এতোরাতে এই টার্নেল এ কি করেন?
গফুর এবারো চুপ করে আছে।
<<<>>>>
এদিকে টার্নেল এর থেকে একটু দূরে আনোয়ার পীর এর দরবেশ মাজার শরীফ। উনি ভক্তদের উদ্দেশ্য বানী প্রচার করছেন। ছেলে, মেয়ে, বয়স্ক সবাই উনার কাছে এসেছে একটা আশার উদ্দ্যেশ নিয়ে।
আনোয়ার বললেন, সবার ওপর মানুষ সত্য তাহার ওপর নাই। সবার প্রথমে আল্লাহ আদমকে সৃষ্টি করছেন। তার পাজরের হাড় দিয়ে মা হাওয়াকে তৈরি করলেন। তয় আল্লাহ যদি সব জানতো যে আদম নিষিদ্ধ ফল খাবে। তাহলে পরীক্ষা কেন করলো?
জনগন চুপ করে শুনছে। কেউ কোন কথা বললো না।
আনোয়ার বলল, আদমকে ২০টা ছোটকিতাব নাজির করে। ওইগুলাকে একত্রে বলে সহিফা কিতাব। আমরা ওই কিতাব অনুসরন করি। সবার প্রথম মানব ও নবী আদম। তাহলে আমরা কেন মুহাম্মদ কে অনুসরন করুম? বুঝান আমারে? মোল্লাদের সাথে আমার তর্ক হইছিল। ওরা বলে মুহাম্মদ কে নাকি আদমের অনেক থেকে থেকে বানাইসে। তয় কোরআনে এটা নাই। এসব ওগো মনগড়া কথা। নিজের নবীরে বড় করে দেখায়। কোরআন এর সূরা বাকারায় স্পষ্ট দেখা প্রথম মানব ও নবী হযরত আদম। তারপর ও মোল্লারা এসব অস্বীকার করে।
তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে আনোয়ার জনগনের দিকে গম্ভীরভাবে চেয়ে রইলেন।
আনোয়ার বললেন, কে কি সমস্যা নিয়ে আসছো। বলো দেখি কি করতে পারি।
ভিড়ের মাঝে এক মহিলা উঠে আসে। আনোয়ার এর পা ধরে সালাম করে।
মহিলা বলে, বাবা আমার তো বাচ্চা হয় না। আজ ৩বছর হইলো। অনেক আশায় আপনার কাছে আইসি।
আনোয়ার মুচকি হেসে উনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, সব মুশকিল সমাধান হইবো। তুমি আজরাতে আমার সাথে থাকবা। তোমাকে মন্ত্র পড়িয়ে পেটে সন্তান এনে দিব।
মহিলা বলে৷, ঠিক আছে বাবা।
আনোয়ার জনগন এর দিকে তাকিয়ে বলেন, আমরা হইলাম আদমের সন্তান। আমি আনোয়ার আদম। তোমরাও আদম সন্তান। আমরা সবাই ভাইবোন। আমাদের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নাই।
এমনসময় ২জন লোক গফুরকে নিয়ে আসলো সেখানে। গফুর এতো অসুস্থ যে সেই ২জন এর কাধে ভর দিয়ে তাকে আনা হয়েছে।
আনোয়ার ইশারায় ২জনকে বললেন, তাকে ঘরে নিয়ে যেতে। চিকিৎসা করাতে।
তারা ২জন খাদেম গফুরকে ঘরে নিয়ে গেলেন।
<<<______>>>>>
এদিকে সাদিক খাটের থেকে উঠে বসলেন। তারপর চাদর উঠিয়ে 'আদমধর্ম' বইটা একনজর দেখলেন। তারপর টেবিল থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে গেলেন৷ উনার মন অস্থির হয়ে আছে।
সাদিক মনে মনে বলল, 'আদমধর্ম' নিষিদ্ধ বই।।এটা কি আমার পড়া উচিত? আমার কি শয়তানের সাথে সাক্ষাৎ করা উচিত? তার কাছে আমি কি চাইবো? টাকা পয়সা? নাকি বিখ্যাত হতে চাইবো? শয়তান আমার ইচ্ছা পূরন করবে নাকি গফুরের মতো অবস্থা হবে?
একসাথে অনেকগুলো প্রশ্ন ঘুরতে থাকে সাদিকের মনে। ঘরের দরজায় ছিটকিনি দিয়ে মাটিতে বসে পড়ে সাদিক। তারপর 'আদমধর্ম' বইটা নিয়ে পড়তে থাকে আনমনে।
সেখানে শয়তানকে ডাকার মন্ত্র আছে, মৃত মানুষ জীবিত করার মন্ত্র আছে। এমনকি কালো যাদুরও মন্ত্র আছে।ভয়ে হাত কাপতে থাকে সাদিকের। এমনকি মৃত মানুষ ডাকার ও মন্ত্র আছে। কি করবে বুঝতে পারে না সাদিক। তার লোভ হয় প্রাক্টিক্যাল এসব করে দেখার।
বইটা অনেক জ্যমিতির চিন্হ। এসব কেন দেওয়া সেটা সাদিক বুঝে না। তার মানে কি জ্যমিতির সাথে যাদুবিদ্যার কোন সম্পর্ক আছে? শোনা যায় সোলেমান নবী যাদু করতেন। জ্বীনদের বোকা বানিয়ে মসজিদ তৈরি করিয়েছিলেন। তবে এই বই পড়ে সাদিক জ্বীনদের ডেকে কি করাবেন?
আবার বইতে সব নাম ইংরেজিতে দেওয়া। জ্বীনদের নাম এখানে এ্যরন বলা হয়েছে। কেন তা সাদিক জানে না। এ্যরনদের কি ডাকা উচিত হবে? এই রাতে?
বইতে লেখা আয়নার সামনে দাড়িয়ে ৩বার মনে মনে 'এ্যরন। এ্যরন। এ্যরন বললেই সে হাজির হবে।
এটা পড়ে হাসি পায় সাদিকের। ঘরের লাইট নিভিয়ে দেয় সে। পুরো ঘর এখন অন্ধকার। একটা মোমবাতি জ্বালায়। তারপর আয়নার সামনে গিয়ে দাড়ায়।
সাদিক মনে মনে বলে, 'এ্যরন। এ্যরন। এ্যরন।'
কয়েক সেকেন্ড পাড় হয়ে যাওয়ার পরও কিছুই হয় না। আয়নায় নিজেকে দেখে হেসে উঠে সাদিক। তারপর মোমবাতিতে ফু দিয়ে বিছানায় চলে যায় ঘুমানোর জন্য।
চাদর মুড়ি দিয়ে শরীর এলিয়ে দেয় বালিশে মাথা রেখে শান্ত ভাবে ঘুমায় সাদিক। তবে তার ধারনাও নাই। সে কি করেছে।
তখনই আয়নায় ফাটল ধরতে থাকে। আর সেখানে একটা কালো ছায়ার মুখময় দেখা দেয়। সেটাই কি তাহলে এ্যরন? সে এসেছে সাদিকের ডাকে?
#আদম_পরিবার
#সিজন_২
#রুদ্র_সিয়াম
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন