সোহানা: আপনি নাকি কবি। কবিতা লিখতে পারেন, গান লিখতে পারেন। আপনার ব্যপারে অনেক শুনেছি এই কলেজে। আজ আপনাকে সরাসরি দেখলাম। আচ্ছা, আপনার কি কোন কবিতার বই ছাপিয়েছেন? ছাপিয়ে থাকলে সেটার নাম কি? আমি পড়তে চাই।
আমি: আমি কোন কবি নই, আমি কবিতা লিখতে পারি না। আমি লিখি গদ্ধ, তোমাকে ভালোবেসে দিলাম নীলপদ্ম।
সোহানা: বাহ্। অসাধারণ কবিতা বললেন তো। তা আপনি এতো ভালো কবিতা বলতে পারেন। আমাকে নিয়ে একটা কবিতা লিখবেন। প্লিজ।
আমি: আপনাকে নিয়ে আমার মনে তেমন কোন অনুভূতি নেই। কবিতা লিখতে হয় অনুভূতি নিয়ে। তাই আপনাকে নিয়ে এখন কবিতা বা গান লেখা আমার পক্ষে সম্ভব না।
সোহানা: শুনেছি কবিরা নাকি খুব রোমান্টিক হয়। আপনি কি রোমান্টিক টাইপের?
আমি: জানি না। আমি আসলে নিজেকে কবি বলে দাবী করি না। আমি শব্দের মিলন ঘটাই। তারপর ছন্দের মিলন ঘটাই। এগুলোতে এমনিতেই কবিতা হয়ে যায়।
সোহানা: আপনার লেখা একটা কবিতা বলবেন। প্লিজ। আমি শুনতে চাই।
আমি: আচ্ছা বলছি।
আমি নিজের লেখা কবিতা আবৃত্তি করলাম।
আমি: নির্ঝুম ঝড় বৃষ্টির রাতে
তুমি হাত বাড়িয়ে জানালার ওপাশে
বৃষ্টি ধরতে চায় তোমার হাত।
কিংবা নির্ঘুম রাতে একাকৃত্বের পাশে
তোমার কথার বলার মানুষকে
ছুয়ে দেখতে চায় তোমার হাত।
তুমি হেসে বেড়াও ঝলমলে হাসি
কিরন ছড়ায় চারিদিকে
সবুজ শ্যমল শষ্যক্ষেতে।
তুমি রংধনু হয়ে রং ছড়িয়ে দাও,
অথবা মনের জানালা খুলে দাও।
হাত বাড়িয়ে একটু বৃষ্টি ছুয়ে দাও।
সোহানা: অসাধরন কবিতা বলেছেন। আচ্ছা। আমরা কি বন্ধু হতে পারি?
আমি: অবশ্যই।
সোহানা হাত বাড়িয়ে দিল হ্যন্ডশ্যাকের জন্য। আমি হ্যন্ডশেক করলাম।
সোহানা: আপনি যদি কিছু মনে না করেন। আমি কি আপনার পাশে বসতে পারি। আসলে দাড়িয়ে থাকতে থাকতে আমার পা ব্যথা করছে।
আমি: হ্যা। অবশ্যই বসুন।
আমি বসে আছি গাছের নিচে। একটু সড়ে গিয়ে তাকে বসার জন্য জায়গা করে দিলাম। সোহানা বসলো আমার পাশে।
সোহানা: আচ্ছা। আপনার পরিবারের ব্যপারে বলুন। কে কি করে? কয়জন ভাইবোন। আর আপনি ই বা কি করেন? আপনাকে তো কলেজেও দেখি না রেগুলার। সপ্তাহে একদিন আসেন। তারপর কি করেন?
আমি হাসলাম।
আমি: তেমন কিছুই করি না। সময় হলে সব জানতে পারবেন। এখন আমি আসি। পরে কথা হবে।
কথাটা বলে উঠে দাড়ালাম।
সোহানা: কোথায় যাচ্ছেন? আরেকটু সময় দেওয়া যায় না। আপনি তো আমার নাম ও জানেন না। আমার নাম সোহানা।
আমি: আচ্ছা। সোহানা। আমি আসি। পরে কথা হবে। আমার কাজ আছে।
কলেজ থেকে বের হয়ে নিজের সাইকেলটা বের করলাম। আমি পার্ট টাইম ফুডপানডায় ডেলিভারি বয় হিসেবে কাজ করি। আমার বাবা মা ছোটবেলায় মারা গেছে। একটা ছোটভাই আছে। ক্লাস ২ তে পড়ে। তাকে নিয়ে একটা ছোট বাসায় থাকি। তার স্কুল খরচ, নিজের কলেজ ফি এসব আমাকেই বহন করতে হয়।
সারাদিন কাজ করার পর রাতে বাসায় ফিরলাম। দেখি ছোট ভাই রিফাত দেরী হয়েছে আসতে আমার। তাই ঘুমিয়ে পড়েছে। হয়তো কিছু খায়ও নি। আমি তার গায়ের ওপর কাথা দিয়ে দিলাম।
তারপর সকালে যে রান্না করেছিলাম। সেগুলো খেয়ে নিলাম।
পরেরদিন আবার সাইকেল নিয়ে বের হয়ে গেলাম ডেলিভারি দিতে। একটা পিজ্জা নিয়ে চললাম ধানমন্ডিতে। দরজায় কলিংবেল দিতেই দরজা খুলে দিল সোহানা। আমি তাকে দেখে মুখে মাক্স পড়লাম। যাতে আমাকে না চিনে ফেলে। কিন্তু সে আমাকে চিনে ফেলল।
সোহানা: আরে রাহুল না। তুমি এখানে কি করছো। তার মানে তুমি ফুড পান্ডায় কাজ করো। হাহাহা। আচ্ছা। দাও আমার খাবার টা দাও।
আমি লজ্জায় কিছু বলতে পারলাম না। নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে। তাই কোন মতে খাবারটা তার হাতে দিয়ে চলে আসলাম।
রাতে বাসায় ফিরে দেখি দরজার বাইরে একটা মেয়ের জুতো। কি ব্যপার? আমার বাসায় আবার কে আসলো। বাবা মা মারা যাওয়ার পর কোন আত্মীয় স্বজন ই আমার খোঁজ নেয়নি। এখন আবার কে আসলো। কলিংবেল টিপটেই দরজা খুলে দিল সোহানা।
আমি: আপনি আমার বাসায় কি করছেন? কখন আসলেন? আর আমার বাসা চিনলেন ই বা কিভাবে?
সোহানা: কেন? আমি কি তোমার বাসায় আসতে পারি না? আমি তোমার বন্ধু। আমার যখন ইচ্ছা আমি তোমার বাসায় আসবো।
আমি: ঠিক আছে। কিন্তু এতো রাতে আমার বাসায় না আসলেও পারতেন। কেউ দেখলে উল্টা পাল্টা ভাববে।
আমি দেখলাম আজও রিফাত ঘুমিয়ে আছে।
সোহানা: আজ ওকে আমি খায়িয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি। ঘরে দেখি খাবার নেই। তাই দোকান থেকে নুডলস এনে বানিয়ে খাইয়েছি। আপনার জন্য রাখা আছে। আপনিও খেয়ে নেন।
আমি: দেখুন। আমি গরীব হতে পারি। কিন্তু আমার আপনার সাহায্যের কোন দরকার নেই। আমার কারো দয়ামায়া চাই না। আপনি বড়লোক মানুষ, আপনি চলে যান এখান থেকে আর কখনও আসবেন না।
সোহানা: এভাবে বলছেন কেন? আমি তো বন্ধু হিসেবে এসব করেছি। তুমি সব কিছু নেগেটিভ ভাবে নেও কেন?
আমি সোহানা কে ঘর থেকে বের করে দিলাম। কিছু মানুষ আছে যারা গরীবদের সাহায্য করে নিজেকে বড় দেখাতে চায়। সোহানা বোধ হয় সেই ধরনের মেয়ে।
পরেরদিন টেষ্ট পরীক্ষা ছিল। তাই সারারাত জেগে পড়লাম। কলেজ গিয়ে কোন মতে পরীক্ষা দিলাম। সোহানাকে দেখেও না দেখার ভান করছি। ওর চোখে অনুতপ্ত দেখছি।
কলেজ থেকে বের হয়ে যাবো। ওমন সময় সোহানা দৌড়ে আমার সাথে এসে দাঁড়ালো।
সোহানা: শোনো। তুমি রাগ করেছো আমি বুঝতে পেরেছি। প্লিজ এমন করো না। আমি সরি বলছি।
আমি: আচ্ছা। ঠিক আছে ক্ষমা করে দিলাম। আসলে কেউ আমাকে দয়া দেখালে আমার ভালোলাগে না। আমি কারো দয়ার বাচতে চাই না। আমি যতটুকু পারি আমার ভাইকে দেওয়ার দিব। এর বাইরে কখনও কারো কাছে হাত পাতবো না।
কথাটা বলে চলে আসলাম। তাড়াতাড়ি বাইসাইকেলটা নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম। কাঁধে ফুড পান্ডার ব্যাগ। রাত ১০টায় বাসায় ফিরলাম।
এদিকে সোহানার আজ ঘুম আসছে না। সে শুয়ে শুয়ে আমার কথা ভাবছে।
সোহানা: আমি আগে কখনও এরকম ছেলে দেখিনি। কি এটিটিউট। ওকে আমার ভালোলেগেছে। কি করা যায়। ফেসবুকে মেসেজ দিব। তবে সে তো ফেসবুক চালায় না। এক কাজ করি কারো কাছ থেকে ফোন নাম্বার নিয়ে কল করি। কিন্তু সে যদি বিরক্ত হয় তাহলে তো আমার সাথে আর কথাই বলবে না রাগ করে।
রিফাত ঘুমিয়ে গেছে। আমি টেবিলে বসে অনেকদিন বাদে একটা কবিতা লিখলাম । তারপর নিজেই কবিতা আবৃত্তি করলাম।
আমি: একাকৃত্বে দম বন্ধ হয়ে আসে তোমার?
কারো সাথে কথা বলতে মন চায় না?
বুঝে নিও এই একাকৃত্ব ভয়াবহ,
রাতের আধারে যে একা করে দিয়েছে তোমায়,
একমাত্র সেই পারে এই রোগ থেকে মুক্তি দিতে তোমায়।
ভয়াবহ এই রোগ মনে দিন দিন কমতে থাকবে,
মধ্য রাতের কোলাহলে হয়তো পাখির ডাকে ঘুম ভেঙ্গে যাবে।
তুমি ফোন হাতে নিবে খুজবে তাকে,
তবে পাবে না জেনেও একটু আশার আলো জ্বালাবে।
দিন যাবে রাত্রি আসবে,
পৃথিবী, সময়, নক্ষত্র চলবে তার আপন গতিতে,
তুমিও হয়তো এক একাকৃত্ব নিয়ে কোন মতে সাতরে পার হয়ে যাবে নিজের গতিতে।
কিছু মানুষ খুব কম সময়ের জন্য আসে,
কিন্তু তারা খুব সহজে মনে জায়গা করে নেয়।
এদের কে তুমি ভুলতে পারবে না,
এদের স্মৃতি নিয়েই তোমাকে বাচতে হবে।
একাকৃত্বের রাত ভোর হওয়ার আশায়,
আমার অশ্রু পড়ে না আর কারো ভালোবাসায়।
কবিতা আবৃত্তি করার পর ছন্দনামে আমি একটা পেজ চালাই। পেজের নাম রুদ্র সিয়াম। পেজে আপলোড করে দিলাম কবিতাটা।
এরকম সময় একটা অচেনা নাম্বার থেকে কল আসলো আমার। আমি কলটা ধরলাম।
আমি: হ্যালো। আসসালামু আলাইকুম কে বলছেন?
সোহানা: আমাকে চিনতে পারছো না। আমি তোমার ক্লাসমেট সোহানা। ঘুম আসছিল না তাই তোমাকে কল দিলাম। আমি আবার এমনি কাউকে কল দেই না। তোমার কথা মনে পড়লো হঠাৎ তাই তোমাকে কল দিলাম।
আমি: দেখুন ম্যডাম। আপনার কথা শুনে বুঝা যাচ্ছে আপনি আমার প্রেমে পড়েছেন। দয়া করে আমাকে আর এরকম কথা বলবেন না। আমি কোন প্রেম ভালোবাসা করব না। এগুলো শুধু আবেগ। একটা সময় পর আবেগ কেটে যাবে। তখন দুটা মানুষ আলাদা হয়ে যায়।
সোহানা: ( রেগে) আমি কি তোমাকে বলছি যে তোমাকে ভালোবাসি বা প্রেমে পড়েছি। সবসময় একলাইন বেশি বুঝো তুমি। শোনো, আমি একটা অর্ডার করতে চাই। কালকে আমাদের বাসায় তুমি পিৎজা নিয়ে আসবা।
আমি: তা ম্যডাম আপনি এ্যাপে গিয়ে অর্ডার করুন। এখানে অর্ডার করতে পারবেন না আপনি। রাখি। বায়।
কথাটা বলে ফোন কেটে দিলাম। ওপাশে সোহানা মনে মনে ভেবে চলেছে।
সোহানা: সব ছেলেরা আমার পেছনে পাগল। আমার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই। কিন্তু এই ছেলেটা এমন কেন? কারো সাথে মিশে না। ঠিকমতো কথা বলে না। আমি তো দিন দিন ওর প্রতি দুর্বল হয়ে যাচ্ছি। কোলবালিশ কে ওর কথা ভেবে জড়িয়ে ধরে ঘুমাই। আচ্ছা। ও কি আমার কথা ভাবে।
এদিকে আমি ভাবছি সোহানার সাথে এরকম খারাপ আচরন করা ঠিক হয়নি। আগামীকাল তাকে সরি বলে দিব।
পরেরদিন পরীক্ষার হলে আমার পেছনের সিটে বসেছে সোহানা। আমি পেছনে তাকালাম দেখি সে বার বার আমার দিকে তাকাচ্ছে। চোখের পলক না ফেলে কি মায়াবতী চোখে তাকিয়ে আছে। তখন পরীক্ষার খাতায় আমি ভুলে কবিতা লিখে দিলাম।
আমি: ভালোবাসার একজন চাই আমি,
রাতে আলিঙ্গন করার মানুষ চাই আমি।
একলাপ্রহর নামছে রাত, বাড়ছে বুকের যন্ত্রণা।
তোমাকে ভালোবেসে তোমার ভালোবাসায়, পুড়তে চাই আমি।
পুড়ে ছাড়খাড় হতে চাই আমি।
তবুও একটু ভালোবাসা দাও,
একটু কাছে টেনে বুকে জড়িয়ে নাও।
তোমার ঠোঁটের আলতো ছোঁয়া দাও।
আমাকে একটু ভালোবাসা দাও।
জানি তুমি ই সেই মায়াবতী,
জানি তুমি ই সেই রুপবতী।
হাজার হোক, তুমি ই আমার কঙ্কাবতী।
তোমাকে নিয়ে লিখেছি শতকাব্য, শতকবিতা। তুমি কি সেগুলোর মর্ম বুঝো?
কবিতা তোমার কাছে অসহ্য লাগে, উপন্যাস তুমি ছুয়েও দেখ না।
তোমার আমার কোন মিল নেই।
তবুও তুমি আমার ভালোবাসার একজন।
তাহলে কি আমিও সোহানার প্রেমে পড়ে গেলাম। আমি এবার আবার পেছনে তাকালাম সোহানা আমাকে দেখে চোখ টিপ দিল।
পরীক্ষা শেষে কলেজের বাইরে দাড়িয়ে অপেক্ষা করছি সোহানার জন্য। সোহানা বেরিয়ে এলো।
সোহানা: কি ব্যপার কারো জন্য অপেক্ষা করছো?
আমি: আসলে আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। যদি কিছু মনে না করো। আমি তোমার ওই চোখের কাজল হতে চাই, তোমার ঠোঁটের লিপস্টিক হতে চাই। তুমি কি আমার আকাশের চাদ হবে?
সোহানা আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
সোহানা: অবশ্যই কেন হবো না। আই লাভ ইউ।
আমি নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম।
আমি: দেখো আমার পরিবার বলতে আমার ছোটভাই রিফাত। তাছাড়া কেউ নেই। আমি হয়তো তোমাকে দামী দামী রেস্টুরেন্টে খাওয়াতে পারব না। কিন্তু যদি কখনও সময় হয় নিজ হাতে নুডলস বানিয়ে খাওয়াবো। কখনও হয়তো রিক্সায় ঘুরাতে পারব না। তবে আমার বাইসাইকেল এর সামনে বসিয়ে ঘুড়াতে পারব।
সোহানা: দেখো আমার কোন রেস্টুরেন্টে খাওয়া লাগবে না। আমি ছোটবেলা থেকে রেস্টুরেন্টে খেতে খেতে এখন আর ভালোলাগে না। আর রিক্সাতে তো উঠি না। আমাদের প্রাইভেট কার আছে। তাছাড়া তোমার সাইকেলে উঠলে হয়তো বেশি মজা পাবো। আজ আমি প্রাইভেট গাড়িতে তোমার সাইকেলে করে আমাকে বাসায় নামিয়ে দাও।
আমি সোহানাকে সাইকেলের সামনে বসিয়ে তাকে বাসায় নামিয়ে দিলাম। সে খুশি হয়ে আমার গালে চুমু দিল। আমি থ হয়ে গেলাম। এসব আবার তার আম্মু বারান্দা থেকে দেখে ফেলছে। যা আমি তখন বুঝতে পারিনি।
সোহানা ঘরে ঢুকতেই ওর মা ওকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে দিল।
সোহানার মা: কিরে। আজকে তুই গাড়িতে না এসে সাইকেলে করে আসলি কেন? আর তোর সাথে ওই ছেলেটা কে ছিল?
সোহানা: আরে আম্মু। ও আমার ক্লাসমেট। খুব ভালো ছেলে। ও ভালো সাইকেল চালাতে পারে আর আমার গাড়ি নষ্ট হয়ে গিয়েছে তাই সাইকেলে করে বাসায় ফিরলাম।
সোহানার মা: গাড়ি নষ্ট হয়েছে নাকি তোর মন নষ্ট হয়েছে। তুই যে ওই ছেলেকে চুমু দিলি। আমি তো ওপর থেকেই দেখলাম। তা কয়দিন ধরে প্রেম চলছে?
সোহানা: আম্মু বেশি দিন না। আজকেই প্রথমদিন তুমি আব্বুকে কিছু বইলো না। উনি তাহলে রাগ করবে। বুঝলা।
রাতে কাজ থেকে বাসায় ফেরার পর আমার মন কোথায়ও বসছিল না। তাই রিফাত কে ভাত খাইয়ে দিয়ে কবিতা লিখতে বসলাম। একটা কবিতা লিখে ফেললাম। সেটা আবৃত্তিও করলাম।
আমি: আমার হাত ছুতে পায় না তোমায়,
সেখানে বৃষ্টির ফোটা তোমায় ছুয়ে দেখে
বড় হিংসে হয় আমার।
তুমি বৃষ্টিতে ভিজে নৃত্য করো নুপুর পায়ে,
তোমার নুপুর বৃষ্টি ছুয়ে যায়।
বড় হিংসে হয় আমার।
তোমার রাতের কোলবালিশ
তোমায় জড়িয়ে ধরে,
তোমার কাথা তোমায় আলিঙ্গন করে
বড় হিংসে হয় আমার।
হ্যা, আমি হিংসুটে।
আমি চাই না,
আমি ছাড়া কেউ তোমার দেহ ছুয়ে যাক
তার নোংরা হাতে।
যে হাত দিয়ে একদিন তুমি আমার
কপালের ঘাম মুছে দিয়েছিলে,
সে হাত শুধু আমার ই হোক।
নয়তো অন্যকারো হলে,
বড় হিংসে হয় আমার।
কবিতাটা রুদ্র সিয়াম পেজে আপলোড করে দিলাম। এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠলো। দরজা খুলে দেখি সোহানা তার কাধে ব্যাগ চোখ মুখে কান্নার ছাপ।
সোহানা: আমি বাসা থেকে বের হয়ে গেছি। এখন থেকে তোমার সাথেই থাকবো। আজ সকালে তোমার সাইকেলে করে যাওয়া আব্বু আমাকে চড় থাপ্পড় মেরেছে। তাই আমি বাসা থেকে বের হয়ে গেছি।
কথাটা বলে কেদে ফেলল সোহানা। আমি তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিলাম।
আমি: কিন্তু একটা ইয়াং ছেলে মেয়ে বিয়ে ছাড়া এক ঘরে থাকা কি উচিত হবে?
সোহানা চোখের জল মুছতে লাগল।
সোহানা: তাহলে চলো কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে করে ফেলি।
আমি: এতো রাতে কাজী অফিস যাবে বিয়ে করতে। তোমার মাথা ঠিক আছে। তুমি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো আমি সোফায় ঘুমাই। তুমি রিফাতের সাথে ঘুমিয়ে থাকো।
সোহানা বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে নিল। তারপর আমি তাকে ভাত বেড়ে খাওয়ালাম। খেতে চায় না৷ তাই নিজের হাতে খাওয়ালাম।
সোহানা কে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে আমি তার ফোন থেকে আংকেল এর নাম্বারটা বের করলাম। তারপর সোহানার আব্বুকে কল করলাম।
আমি: হ্যালো আংকেল। আপনি কোন টেনসন করবেন না। আপনার মেয়ে আমার কাছে আসে। একদম নিরাপদ।
আংকেল: তা বাবাজি। তোমার বাসা টা যেন কোথায়?
আমি: আমি লোকেশন দিয়ে দিচ্ছি। আপনি ওকে কাল নিয়ে যাবেন।
আংকেল : গুড নাইট।
সকালে কলিংবেল এর শব্দে ঘুম ভাঙলো। দরজা খুলে দেখি কয়েকজন ছেলে হাতে ক্রিকেট এর ব্যাট নিয়ে দাড়িয়ে। একজন আমাকে ক্রিকেট এর ব্যাট দিয়ে মাথায় আঘাত করলো। আমি পড়ে গেলাম মাটিতে। তারপর আর কিছু মনে নেই।
আজ ২ বছর পর। আমি পাগলের মতো সোহানা সোহানা বলে রাস্তায় দৌড়াই। আমার চুল দাড়ি কাটা হয়নি। সেদিন মাথায় আঘাত লাগায় আমি পাগল হয়ে গেছি। ভালোবাসা ভুল নয়। তবে ভালোবেসে আজ আমার এই অবস্থা।
সোহানার বিয়ে হয়ে গেছে। তার স্বামীর সাথে বাইকে করে যাচ্ছিল। হঠাৎ দেখলো এক পাগল দেয়ালে কবিতা লিখছে। সোহানা কবিতাটা পড়ছে। রাস্তায় জ্যাম তাই গাড়ি আটকে আছে।
সোহানা: তারপর আর কাউকে ভালোবাসিনি,
একতলা চিলেকোঠা ঘরে থাকব বলে স্বপ্ন আকিনি।
কত মানুষ আসে যায় জীবনে,
সবাই কি আর পারে মনে জায়গা করতে?
সে পেরেছিল বলেই কী?
তাকে উৎসর্গ এই কবিতা।
সন্ধার সূর্য্যর মতো সে ডুবে গেল পশ্চিমে,
রাতের আঁধারে আমার বালিশের কান্না শুনি দক্ষিনে।
তার ও কি এমন অনুভূতি হয়?
জানতে চেয়েও জানতে পারি না আমি,
এক অদৃশ্য কাচের দেয়াল যেন
আমাকে আটকায় তার কাছে যেতে।
সে দেয়ালের নাম ইগো কিংবা সেলফরিসপেক্ট।
কিছু অনুভুতি রাতের মেঘের মতো
স্মৃতি হয়ে আনাগোনা করে
আমার মস্তিষ্কের শহরে।
আমি চাইলেও ভুলতে পারি না তাকে।
কবিতা পড়ে সোহানার চোখে জল চলে আসলো। জ্যাম শেষ হয়েছে। গাড়ি আবার চলতে শুরু করেছে। সোহানা মনে মনে কথা বলছে।
সোহানা: সেদিন আমার কারনেই আজ তোমার এই অবস্থা। আমি কত স্বার্থপর। তোমাকে ভুলে স্বামীর সংসার করছি আর তুমি এখনও আমাকে নিয়ে কবিতা লিখে যাচ্ছো। অনেক ভালোবাসি তোমাকে।
কিছু ভালোবাসা অপূর্ণ থাক,
ইশ্বর কি তোমার আমার মিলন
লিখতে পারতো না।
(সমাপ্ত)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন