মা যখন বললেন যে আমার বিয়ে হবে আমার খালাতো বোনের সাথে। সে কথা শুনেই আমি ভয়ে বাসে করে কক্সবাজার চলে আসলাম। এখানে একটি হোটেলে উঠেছি নিজেকে লুকিয়ে রাখার জন্য। আমাকে পেলেই মা-খালা মিলে বিয়ে দিয়ে দিবে। তাই কয়েকদিন লুকিয়ে থাকি। যখন সুরভীর বিয়ে হয়ে যাবে। তখন আমি আবার বাড়ি চলে যাবো।
হ্যা! সুরভী ই আমার খালাতো বোনের নাম। এবার ক্লাস টেনে উঠেছে আর তাকে বিয়ে দিয়ে আমার ঘাড়ে চাপানোর প্লান করছে আমার মা আর খালা।
হোটেল রুমে ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ কলিংবেলের শব্দে তড়াক করে উঠে। দরজা খুলতেই দেখি একটা ফুলের তোড়া হাতে কে যেন দাড়িয়ে আছে। ফুলটার গন্ধ নিতেই আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম। জ্ঞান ফিরলে দেখি আমার হাত,পা বাধা করে আমাকে গাড়িতে করে কোথায়ও যেন নিজে যাওয়া হচ্ছে। তার মানে কি আমাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে। গাড়ি যে চালাচ্ছে। সে রাকিব। আমার বন্ধু!
রাকিব: দোস্ত! টেনসন করিস না! লাইফে একবার না। একবার তো বিয়ে করতেই হবে। বিয়ে থেকে পালালে হবে? আমাদের ধর্মে তো বিয়ে করা ফরজ। তাহলে তুই পালিয়ে বেড়াচ্ছিছ কেন?
আমি: তুই কিভাবে জানলি যে আমি কক্সবাজারের হোটেলে আছি? তোকে কে খবর দিল?
রাকিব: আরে! বেটা! এখন ইন্টারনেটের যুগ। তুই নিজেই তোর কক্সবাজারের ছবি তু্লে ফেসবুকে দিয়েছিছ। ছবির নিচে লোকেশন দেওয়া ছিল। তাই তোকে খুজে বের করতে অসুবিধা হয়নি।
আমি: সালা! নিজের ভুলের জন্য নিজেকেই থাপড়াতে মন চায়। তুই আমার গালে একটা থাপ্পড় দে।
রাকিব: তোকে আগে বাসায় নিজে যাই। তারপর তোর বিয়ে দিব। তখন আমাদের থাপড়ানোর দরকার পড়বে না। তোর বউ ই তোকে থাপড়াইয়া ঠিক করে ফেলবে। এখন বল ঘর থেকে পালিয়ে গেলি কেন?
আমি: আমার কষ্টের কথা কী বলবো? আমার যে রোগ বিয়ে করতে ভয় লাগে। ইন্টারনেটে এই রোগ নিয়ে সার্চ করেছি। এটাকে বলা হয় গ্যামো ফোবিয়া। এটা গ্রীক শব্দ। গ্যামো মানে বিয়ে আর ফোবিয়া মানে ভয়।
রাকিব: তুই বিয়ে করতে ভয় পাচ্ছিস কেন?
আমি: এটা জানার জন্য আমাদের ফ্লাশবেকে যেতে হবে। জানতে হবে অতীতের ছোটবেলার কথা। জানতে হবে আমার আর সুরভীর কাহিনী।
রাকিব: ঢাকা যেতে এখনো ৬ ঘন্টা লাগবে। তুই তোর কাহিনী বল। আমি শুনছি আর গাড়ি চালাচ্ছি।
আমি : আগে আমার হাতের বাধন খুলে আমাকে মুক্ত কর। তারপর আমাকে একটা সিগারেট দে। সিগারেট টানতে টানতে গল্প বলি।
রাকিব আমার হাতের বাধন খুলে দিল। তারপর আমাকে একটা সিগারেট দিল। এখন আমি গাড়ির পেছন সিট থেকে উঠে বসেছি সামনের সিটে রাকিবের পাশে। সিগারেটে টান দিয়ে আমি গল্প বলা শুরু করলাম।
আমি: যখন আমার বয়স ১০। তখন সুরভী জন্ম হয়। ওকে যখন প্রথমবার কোলে নেই। তখন ই ও আমার শার্ট ভিজিয়ে দেয়। ওর জন্মের প্রথম দিন থেকেই আমার সাথে শত্রুটা শুরু হয়ে গেল। আমি ওকে দেখতে পারি না। বয়স বাড়ার সাথে সাথে। ওর যখন ৫ বছর। তখন দেখি আমার আম্মু কে আম্মু ডাকছে। মেজাজ গরম হয়ে গেল। এই মেয়ে আমাকে একটুও ভালো থাকতে দেয়নি।
রাকিব: হাহাহা। এখানে আমি তোর বিষয়টা বুঝতে পারলাম না। সুরভীকে তুই অপছন্দ করিস কেন? তা এখনো আমার কাছে ক্লিয়ার না।
আমি: তাহলে আমার ফ্লাশবেকে যাই। যখন সুরভীর বয়স ১০। তখন আমাকে ভাইয়া না ডেকে ডাকতো জামাই জামাই বলে। খালা আম্মু কিছু বলতো না। দুজনই মজা পেতে। আমি রেগে যেতাম। মন চাইতো থাপ্পড় দেই।
রাকিব: হাহাহা! তাহলে ছোটবেলা থেকেই সুরভী তোকে পছন্দ করতো? তাহলে তো ভালোই হলো। এখন তাহলে বিয়েটা করে ফেল। দোস্ত! অনেকদিন ধরে পোলাউ কোরমা খাই না।
আমি: তুই আছিছ তোর চিন্তায়। এদিকে আমি নিজের চিন্তায় বাচি না। সুরভীকে বিয়ে করা মানে নিজের গলায় ফাসি দেওয়া। একই হিসাব।
রাকিব: তারপর বল! সুরভী ছোটবেলায় আর কী করতো?
আমি: একবার গিয়েছিলাম ওদের বাসায়। তখন ওর বয়স ৬। আমি ওর জন্য চকলেট নিয়ে যাইনি বলে। আমাকে কিল ঘুষা দিতে শুরু করলো। আমি পড়লাম বিপদে। খালা খালু দেখি মজা পেয়ে হাসছেন। বিপদ থেকে রক্ষা করলো খালাতো ভাই সিজান। ও এসে সুরভীর গালে একটা চড় দিল। সিজান আবার আমার খুব ভক্ত। আমার কথায় উঠে বসে। আমার সাথে কেউ বেয়াদবি করলে সেটা মেনে নিতে পারে না। তা ওর বোন ই হোক না কেন?
রাকিব: তোর কথার সুরভীর সাথে বর্তমানের সুরভীর কোন মিল নেই। আকাশ পাতাল তফাৎ।
আমি: মানে?
রাকিব: তুই সুরভীকে কত বছর ধরে দেখিস না। মানে কতবছর হলো তুই ওদের বাসায় যাস না?
আমি: প্রায় ৫ কি ৬ বছর হবে। আমার আবার কারো বাসায় যেতে ভালোলাগে না। আর ওরা তো গ্রামে থাকে। গ্রামে গেলে নেট প্রবলেম দেয়। এজন্য যাই না।
রাকিব: এই ৫ বছরে সুরভী অনেক চ্যন্জ হয়েছে। আগের মতো রাগি না। এখন খুবই শান্তশিষ্ট আর ভদ্র। চোখে কাজল দেওয়া মায়াবতী মেয়ে। যাকে দেখলেই প্রেমে পড়া যায়।
আমি: তুই ওদের বাসায় গেলি কখন?
রাকিব: ২দিন আগে আমি আর আন্টি। মানে তোর আম্মা মিলে গিয়েছিলাম সুরভীকে দেখতে। সেখানেই বিয়ের কথা ঠিক করা হয়েছে। আগামীকাল ই তোর বিয়ে। আমি তাদের বলেছি জামাই কোথায় পালিয়েছে আমি জানি আর আমি তাকে ধরে নিয়ে আসবো।
আমি: এতো তাড়াহুড়া করার কী ছিল? আগামীকাল বিয়ে মানি কি? আমার তো এখনো বিয়ের শপিং ই করলাম না।
রাকিব: আমার শরীরের মাপ দিয়ে তোর শপিং করা হয়েছে। কারন তোর আর আমার শরীর প্রায় একই মাপের।
আমি: এজন্যই তো তুই আমার জামা কাপড় নিয়ে আর ফেরত দেস না। কালো শার্ট টা ফেরত দিয়ে যাস।
রাকিব: ওটা তুই ভুলে যা। কোনদিনও পাবি না।
আমি জানি রাকিব অনেক ধনী ঘরের ছেলে। তবুও ও বন্ধুদের জামা কাপড় নেয় ভালোবেসে। সেগুলো পড়তে ভালোবাসে। আর রাকিব হচ্ছে সেইরকম ছেলে। যাকে বিপদে পাশে পাওয়া যায়। একবার রাতে বাসায় ফেরার সময় শুরু হলো বৃষ্টি। আমি রাকিবকে কল করেতই দেখি ও ছাতা নিয়ে চলে এসেছে। এরকম বন্ধু পাওয়া একধরনের ভাগ্যের বেপার।
আজ আমার আর সুরভীর বিয়ে। রাকিব আমাকে পান্জাবি পায়জামা পড়িয়ে দিল। রাকিব বন্ধু হলেও ও হচ্ছে আমার ভাইয়ের মতো। সবসময় সাহায্য করে।
রাকিব আমাকে বিয়ের পান্জাবি পড়িয়ে দিচ্ছে।
রাকিব : দোস্ত! বিয়ের পর ভাবিকে পেয়ে আমাদের আবার ভুলে যাস না।
আমি: দুর! আমি কি আট দশটা বন্ধুর মতো। যে বউ পেলে বন্ধুদের ভুলে যাবো। বউ ২দিনের আজকে ভালোলাগলো না, কালকে ডিভোর্স দিয়ে দিবো। কিন্তু বন্ধুত্ব আজীবনের।
রাকিব: তুই যদি সুরভীকে ডিভোর্স দিয়ে দেস। তাহলে তখন ওকে আমি বিয়ে করে নিব।
আমি: সালা! হারামি কোথাকার। যা ভাগ এখান থেকে।
রাকিব: এখান থেকে ভাগলে তোকে পান্জাবি পড়িয়ে দিবে কে?
রাত ১০টা আমি,আম্মু ও রাকিব। বিয়ে বাড়িতে উপস্থিত হলাম। গ্রামের বিয়ে যেমন হয়। একদম নীরবতা। কোন গান বাজনা নেই। তারা নাকি ধার্মিকভাবে বিয়ে দিবে। তাই গান বাজনার ব্যবস্থা করে নাই। এমনকি গেট ধরে যে টাকা তুলবে। সেটাও করে নাই। আমি তো আগেই বিয়ে করতে চাচ্ছিলাম না। এখন এসব দেখে মন চাইছে এখনই চলে যাই।
আমি: আমি বিয়ে করব না, আমি চলে গেলাম। তুই আম্মুকে নিয়ে বাসায় আয়।
রাকিব: দোস্ত! পাগলামি করিস না। তোর খালারা আগে নাকি বড়লোক ছিল। এখন গরীব হয়ে গেছে। তাই এতো কম বয়সী মেয়েকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিচ্ছে।
কথাটা শুনে অবাক হলাম। খালারা গরীব হলেন কিভাবে? তা আমি জানতাম না। ওনারা যখন বড়লোক ছিল। তখন আমরা ছিলাম গরীব। আমার যখন ৫ বছর। তখন বাবা মারা যান। উনি প্রচুর ধুমপান করতেন। তাই উনার ক্যনসার ধরা পড়ে। আর যখন তিনি মারা যান। তখন আফসোস নিয়ে মারা যান যে উনার কাছে এখন পরিবার ভালোবাসার মানুষ সব আছে, কিন্তু উনি থাকবেন না। তারপর আম্মু ই আমাকে একা মানুষ করান। পড়াশোনা বেশি করতে পারিনি, মাত্র ৮ম শ্রেনিতে উঠার পরই আমাকে কাজে দিয়ে দেওয়া হলো। অল্প বয়স থেকেই আমি শিখতে লাগলাম কাপড়ের ব্যবসা। একসময় আম্মু ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে আমাকে ইসলামপুরে দোকান নিয়ে দিলেন। আর সেখান থেকেই নিজের জীবনের মোড় ঘুরে গেল। আমাদের আর ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন আমার নিজের ৩টা দোকান। যখন আমরা অসহায় ছিলাম। তখন খালা আমাদের সাহায্য করেননি। তাই যখন এটা জানতে পারলাম। যে আম্মু অনেক কষ্টে দর্জির কাজ করে আমাকে মানুষ করেছেন। আমার বন্ধু-বান্ধব, পরিবার কেউ আমাদের সাহায্য করেনি।
আজ যখন আমি প্রতিষ্ঠিত। তখনই খালা নিজের মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য পাগল হয়ে গেলেন। এসব রাজনৈতিক চাল আমি আগেই বুঝতে পেরেছি। আম্মু কষ্ট পাবে বলে উনাকে কিছু বুঝতে দেইনি।
অবশেষে একটা কাজী ডেকে এনে আমাদের বিয়ে দেওয়া হলো। আমি চাইলে ঢাকায় কমিনিটি সেন্টার নিয়ে বিয়ের আয়োজন করতে পারতাম। কিন্তু করিনি, কারন এই বিয়েতে আমার মত ছিল না।
এখন আমার আর সুরভীর বাসর রাত হবে। প্রায় সব ছেলেরাই এই রাতের জন্য অপেক্ষা করে। আমি অপেক্ষা করছি কখন ঘুমাবো। ঘরে ঢাক্কা দিয়ে ঢুকিয়ে দিল রাকিব। ঘরে ঢুকতেই দেখি সুরভী লাল শাড়ি পড়ে খাটের ওপর বসে আছে। আমি কোন কথা বললাম না। সোজা গিয়ে সুয়ে পড়লাম খাটে।
আমি: দেখুন! আমি খুব ক্লান্ত! আজ কোন কথা বলতে পারব না। আর আপনি জামা কাপড় চ্যান্জ করে শুয়ে পড়ুন। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। আর দয়া করে আমার থেকে ১হাত দুরে ঘুমাবেন। আমার ঘুম খুব পাতলা। কারো শরীরের সাথে শরীর লাগলে আমার ঘুম ভেঙ্গে যাবে।
আমি আমার আর সুরভীর মাঝে একটা কোলবালিশ রাখলাম। এই মেয়েকে আমি ছোটবেলা থেকেই দেখতে পারি না। এখন ওকে কষ্ট দিয়ে ভালোলাগছে।
সুরভী: আপনি যা বলবেন। আমি তা মেনে নিবো। উঠুন বলছি এখন গল্প করব আমরা। আপনি যদি এখন ঘুমান। তাহলে আমি আপনার ওপর ঠান্ডা পানি মারবো।
আমি মনে মনে ভয় পেয়ে গেলাম। মনে মনে বললাম, আল্লাহ এ কোন মুহিসবতে পড়লাম? আমাকে উদ্ধার করো। বিয়ের প্রথম রাতেই যদি পানি মারে স্বামিকে। তাহলে শেষ রাতে মনে হয় গলা টিপে মারবে।
সুরভী: কি কথা কানে যাচ্ছে না আপনার? উঠছে বলছি উঠবেন নাকি লাথি মেরে খাট থেকে ফেলে দিবো।
লাথি খাওয়ার ভয়ে আমি তড়াৎ করে উঠে বসলাম। মানুষ নাকি বউয়ের কথায় উঠবস করে। এখন আমারো একই দশা হয়েছে। তাই বিয়ে করার আগে সাবধান হও যুবক!
সুরভী: এই তো গুড। আমার লক্ষী স্বামীটা। এবার আমি আপনাকে আমার প্রেমের গল্প বলবো। আপনি জেনে খুশি হবেন। আপনার বউ জীবনে ৪০ টারও বেশি প্রেম করেছে। কিন্তু শেষবারারের প্রেমটা রিয়েল ছিল। আর তখন ই আপনি আমাকে বিয়ে করে ফেললেন।
আমি: দেখেন! আমি প্রেমের গল্প শুনতে ভালোলাগে না আমার। আপনি ৪০ টা কেন ১০০টা প্রেম করলেও আমার কিছু আসে যায় না। করতেই পারেন স্বাভাবিক!
সুরভী: তা আপনি কয়টা প্রেম করেছেন জীবনে?
আমি সরল মনে উত্তর দিলাম।
আমি: বেশি না ২ টা। একটা ছিল বারোভাতারী। আরেটা ছিল লোভী মেয়ে।
সুরভী রাগি চোখে তাকিয়ে আছে।
সুরভী: আসলে আমি আপনাকে পরীক্ষা করলাম যে আপনি প্রেম করছেন না। আমি আমার লাইফে একটাও প্রেম করিনি, সব ছেলেকে রিজেক্ট করে দিয়েছি নিজের হবু বরের জন্য। আর আপনি দুই দুইটা প্রেম করেছেন?
আমি: এতো ওভার রিয়েক্ট করার কি আছে। এটা কি কোন নাটক হচ্ছে? এখন আসল কথায় আসি। এই বিয়েতে আমার মত ছিল না, আম্মুর কথায় বিয়ে করেছি। তুমি থাকবে তোমার মতো আমি আমার মতো। ঠিক আছে?
সুরভী: না! ঠিক নেই। কোনকিছু ঠিক নেই। শাশুড়ি মা আমাকে বিয়ের আগেই এসব বলেছেন। আপনি যে কেমন তা আমি ছোটবেলা থেকেই জানি। ভালোবাসেন ঠিকই। কিন্তু মনের কথা বলতে পারেন না।
আমি: তুমি দেখি বাচাল মেয়ে। অনার্গল কথা বলে যাচ্ছো। এখন চুপ করে ঘুমাও!
সুরভী: আপনি আমাকে বাচাল বললেন। এখন কিন্তু আমি কেদে ফেলবো। আর আমি একবার কাদলে আমাকে কেউ থামাতে পারে না। আমাকে সরি বলুন। না হলে আমি এখন হাউমাউ করে কাদবো।
এই বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে ভালো একটা ভেজালে পড়লাম। এই মেয়ে আছে কল্পনার জগৎ এ। বাস্তবে সংসার কী? তা বুঝবে ২দিন পর।সুরভীর মতো ১৫ বয়সের মেয়েরা ভাবে সংসার মানে সারাদিন স্বামীর ভালোবাসা আর ভালোবাসা। কিন্তু বাস্তবে স্বামী কখনও প্রেমিক হতে পারে না। দুজন মানুষ একসাথে থাকতে থাকে বিরক্ত লেগে যায়। তখন তারা চায় ডিভোর্স। আচ্ছা! এমনকি কোন মেয়ে আছে যাকে দেখলে মনে হবে এর সাথে আজীবন কাটিয়ে দেই।
সুরভী: কি ভাবতেছেন এতোক্ষন ধরে। নিশ্চই কোন মেয়ের কথা। তাই না?
খালাতো বোন যখন বউ ৩
সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখি কফি হাতে দাড়িয়ে আছে সুরভী।
সুরভী: এই নেন। আপনার জন্য কফি বানিয়ে আনলাম। মায়ের কাছ থেকে জেনেছি আপনার কফি খুব পছন্দ।
আমি: আমি ঘুম থেকে উঠে কফি খাই না। আমি প্রথমে একটা সিগারেট খাই। তারপর নাস্তা করে কফি খাই। দাও! আমার সিগারেটের প্যাকেটটা দাও!
সুরভী: সিগারেটের প্যাকেট আমি টয়লেটে ফেলে দিয়েছি, এখন থেকে আপনাকে আমি আর সিগােরট খেতে দিব না। আপনি কি ভুলে গেছেন? খালু মারা গেলেন এই সিগােরটের কারনে। আপনিও তো একই ভুল করবেন।
আমি: দেখ! আমার লাইফ। আমার যা ইচ্ছা করবো। তুমি এসব বলার কে? আমি তোমাকে বউ মানি না। কখনও মানবোও না।
সুরভী চোখের কোনা ভিজে উঠেছে আমি লক্ষ্য করলাম। ভালোই হয়েছে। সবসময় আমাকে বিরক্ত করে। উচিত শিক্ষা হয়েছে।
২০ দিন পর:
প্রতিদিন সুরভী ঘুম থেকে উঠেই দেখতাম কফির মগ হাতে নিয়ে দাড়িয়ে থাকতো। আমার আমার বকা খেত। আমি ওকে একদমই দেখতে পারি না।
আমি তখন আয়নার দাড়িয়ে তৈরি হচ্ছিলাম অফিসে যাওয়ার জন্য। দেখলাম ব্যাল্ট নেই।
আমি চেচেিয়া উঠলাম.
আমি: সুরভী! সুরভী! আমার ব্যাল্ট কোথায়? ব্যল্ট ছাড়া কি আমি অফিসে যাবো? একটা জিনিস ও ঘরের ঠিকমতো ঠিক জায়গায় পাই না।
সুরভী ব্যল্ট হাতে দাড়িয়ে আছে, আমার কাছে এসে আমাকে ব্যল্ট পড়িয়ে দিল।
সুরভী: নিজের জিনিস নিজেকে যত্ন নিতে হয়। যখন হারিয়ে যাবে, তখন বুঝেন যে ব্যাল্ট এর আসল মুল্য। যখন থাকে তখন তো বুঝেন না।
আমি: হয়েছে। তোমাকে আর জ্ঞানি জ্ঞানি কথা বলতে হবে না। আমার চোখের সামনে থেকে যাও।
সুরভী চলে গেল। এবারো আমি তার চোখে অশ্রু দেখলাম।
পরেরদিন সকালে দেখি কফি হাতে মুর্তির মতো দাড়িয়ে আছে। আমি তার হাত থেকে কফি নিলাম। সে ভাবলো আমি কফি খাবো। তাই হেসে ফেললো। তারপর কফিটা ফেলে দিলাম জানালা দিয়ে।
গতকাল দোকানের ১ চুরি করে করে আমার এক কর্মচারী পালিয়ে গেছে। তাই আজ আমার মন মেজাজ খুব খারাপ।
খাবার খেতে বসে দেখি। ডিমে লবন বেশি আবার রুটি ঠিকমতো ভাজা হয়নি, পুড়ে কালো হয়ে গেছে।
আমি: সুরভী! সুরভী!
সুরভী আমার সামনে আসলো।
আমি: এটা কি রুটি নাকি অন্য কিছু। একটা কাজও ঠিকমতে করতে পারো না তুমি? তোমাকে দিয়ে আমার কিছু হবে না।
কথাটা বলে রুটি ও ভাজি ছুয়ে মারলাম সুরভীর মুখে। বেচারী অপমানে চুপ হয়ে আছে। তার চোখ ছল ছল করছে। কিন্তু কোন কথা বলছে না।
আমি: ডিমে লবন এতো বেশি কেন? ডিম মামলেট করেছো। লবন কতটুকু দেয়। তাও জানো না?
সুরভী: আসলে আমার বাবা মায়ের বাসায় আমাকে রান্না করতে দিতো না। আর আমি কখনও রান্না বান্না করি নি।
ঠাস করে একটা থাপ্পড় দিলাম সুরভীর গালে।
আমি: বড়লোকি দেখাও আমাকে। তোমার এসব বড়লোকি কথাবার্তা এখানে চলবে না। ঠিকমতো রান্না করতে পারলে থাকবে। না হলে চলে যাবে।
রাত ১০ টা বাসায় ফিরলাম। আজ খুব টায়ার্ড লাগছে। টাকা টা যে চুরি করে পালিয়েছিল। তাকে র্যাব ধরে ফেলেছে। বেচারা কে রিমান্ডে দেওয়া হয়েছে।
বাসায় এসে দেখি ঘর কেমন ফাকা ফাকা! মা শুয়ে আছেন উনার বিছানায়। আজকাল উনি সারাদিন শুয়ে থাকেন। উনার শরীরটাও ভালো না। আমি বসলাম পায়ের পাশে।
আমি: মা! সুরভী কোথায়? ওকে তো কোথায়ও দেখছি না।
মা: তুই মেয়েটাকে এতো অবহেলা এতো অপমান করেছিছ। যে মেয়েটা সহ্য করতে না পেরে চলে গিয়েছে।
আমি: ওহ! আচ্ছা! ঠিক আছে।
কথাটা বলে চলে আসলাম নিজের ঘরে। আজ কেন জানি ঘুম আসছে না। বুকের ভেতরে চাপ অনুভব করছি। কেমন যেন হাহাকার। কি একটা নেই। কি একটা নেই। আমি কেন জানি সুরভীর না থাকার অভাবটা বুঝতে পারছি।
সকালে ঘুম থেকে উঠলাম। কিন্তু আজ আর কেউ কফি হাতে দাড়িয়ে নেই। বুকের ভেতরটা কেমন হাহাকার করে উঠলো। এসবের মানে কী?
যখন আয়নার সামনে দাড়িয়ে অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছিলাম। তখন দেখি চিরুনি নেই।
আমি চেচিয়ে উঠলাম।
আমি: সুরভী! চিরুনি কোথায়?
কোন উত্তর পাওয়া গেল না। কারন সুরভী তো নেই। সে চলে গেছে তার বাবার বাড়ি।
খাবার টেবিলে খেতে বসে দেখি আলু ভাজিতে লবন হয়নি।
আমি: সুরভী! ভাজিতে লবন দাও নি কেন?
মা নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
মা: সুরভী! তো বাবা নেই। আজ খাবার আমি বানিয়েছি।
আমি: সমস্যা! নেই মা আমি এমনিতেও লবন কম খাই।
মা: তুই সবসময় মেয়েটার পেছনে লেগে থাকতি। মেয়েটাকে সবসময় বকা ঝকা করতি। আজ দেখ সে নেই। কিন্তু তবুও সে তোর মনের কোথায়ও যেন আছে।
রাতে বাসায় ফিরলাম তাড়াতাড়ি। কেন জানি কাজে মন বসছে না। কি যেন নেই। কি যেন নেই। হঠাৎ এরকম হচ্ছে কেন আমার?
বাসায় এসবে আম্মুর রুমে গিয়ে আম্মুর পাশে বসলাম। আম্মু শুয়ে আছেন।
আমি: আমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি। আমার উচিত হয়নি। ওর সাথে এমন ব্যবহার করার। এখন আমি আমি কি করবো মা?
মা: তুই ওকে বাসায় ফিরিয়ে নিয়ে আয়। ও যে শুধু তোর একার যত্ন করতো। তা না। আমারো ঔষুধ পত্র টাইমে টাইমে দিত।
আমি: সুরভী যদি ফিরে না আসে? তখন আমি কি করবে?
মা: তখন তুই ওকে জোর করে ফিরিয়ে নিয়ে আসবি। পারবি না?
আমি: অবশ্যই। পারবো মা।
পরেরদিন সকালবেলা গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম গ্রামের উদ্দেশ্যে। আবদুল্লাহপুর থেকে মিষ্টি কিনে আমরা চললাম আরো ভেতরে। গাড়ি এসে থামলো তাদের উঠানে।
আমি ঘরে ঢুকে খালা খালুকে পায়ে ধরে সালাম করলাম। তারপর বললাম, সুরভী কোথায়?
তারা উত্তর দিল যে বাড়ির পেছনের বাগানে সে বসে আছে। আমি দৌড়ে সেখানে পৌছালাম।
সুরভী বসে আছে গাছের নিচে। তার কানে হেডফোন। আমি তার সামনে যেতেই আমার হার্ডবিট বেড়ে গেল। সুরভী আমাকে দেখে উঠে দাড়ালো। কানের থেকে থেকে হেডফোন খুললো। তারপর দৌড়ে এসে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। আমিও তাকে জড়িয়ে ধরলাম।
আমি: আমাকে ক্ষমা করে দাও সুরভী! আমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি। তোমাকে ছাড়া এই কয়েকদিন আমার একা থাকতে খুব কষ্ট হয়েছে।
সুরভী: আমি বুঝি সুখে ছিলাম? আমার নিজেরও এখানে ভালোলাগেনি। নিজের বাপের বাড়ি। এখানে ছোটবেলা থেকে বড় হয়েছি। কিন্তু এখন তোমাকে ছাড়া আমি এখানে সত্যি ই খুব একা।
আমি: আমি তোমাকে ভালোবাসি সুরভী! যতোই জগড়া বাধা বিপত্তি আসুক। প্রমিজ করো! আমাকে কখনও ছেড়ে যাবে না।
সুরভী: প্রমিজ করছি কখনও ছেড়ে যাবো না। কিন্তু তুমিই তো সবসময় আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করতে আমার দোষ কি বলো? আমি তো তোমাকে একটু ভালো রাখতে চেয়েছি মাত্র।
আমি: সরি! আমার ভুল হয়ে গেছে। বাড়ি চলো। আমি আর কখনও তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করব না।
সুরভী: এখন থেকে শুধু আমাকে ভালোবাসবা। ঠিকাছে? মনে থাকবে তো?
আমি: ওকে! মনে থাকবে।
তারপর আমি আর সুরভী একে অপরের হাত ধরে বসে আছি গাড়িতে । আমাদের গাড়ি ছুটে চলেছে। আর আমরাও ছুটে চলেছি ভবিষ্যতের দিকে। ভালো দিনগুলোর দিকে।
(সমাপ্ত)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন