আমি মোকলেস মিয়া এই অজপাড়া গ্রামের একমাত্র ঘটক। আমার কাজ কোন অবিবাহিত সুন্দরী মেয়ে খুজা। তারপর ওই মেয়ের বিয়া দেওয়া।
বগলের নিচে কালো ছাতা রেখে গ্রামের কাচা পথ দিয়ে হেটে যাচ্ছিলাম। রাস্তার পাশে দেখি একটা বিড়ি পড়ে আছে। কে যেন অর্ধেক খেয়ে অর্ধেক রেখে গেছে। আমি আশে পাশে তাকালাম। না কেউ নেই। তারপর বিড়িটা তুলে নিলাম।
বিড়ি টানতে টানতে সামনে এগিয়ে গেলাম।
আমগাছ ৩ গলায় তিন বান্ধবী মিলে আমে ঢিল মারছিল। তাদের নাম তুবা, জুই আর জান্নাত। তুবা একটা ইট ছুড়ে মারলো আমকে লক্ষ্য করে। সেই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল ঘটক মোকলেস মিয়া। ইট টা উড়ে গিয়ে তার মাথায় লাগলো। ঠপাস করে তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন মাথা ফেটে রক্ত বের হতে শুরু করেছে।
এসব দেখে ৩ বান্ধবী হাসতে লাগলো।
তুবা বলল, একদম ভালো হইসে। ঘটকের মাথায় ইটা পড়ছে। আমার বান্ধবীকে বিয়া দিয়া দিসে ঢাকায়। এর উচিত শিক্ষা হইসে।
ঘটক মিয়া উঠে দাড়াতে আর মাথায় হাত দিয়ে তাদের ৩ বান্ধবীর সামনে এসে দাড়ালো।
ঘটক: কিরে। ইট মারছে কেডা আমার মাথায়? একদম মাথা ফাডায় দিসে।
তুবা: আমি মারসি কাকা। সরি, আম পাড়তে গিয়ে ভুলে আপনার মাথায় ফাটায় দিসি।
ঘটক: তুই আসাদের মেয়ে না? দাড়া তোর বাপের কাছে বিচার দিব। তোর বয়স যেন কত?
তুবা: বয়স জেনে কি করবেন? আমারেও বিয়ে দিয়ে দিবেন?
ঘটক: হ। তোরেও বিয়া দিয়ে দিব। আমার কাছে ভালো পোলা আছে।
জুই: কাকা। সবাইরে বিয়া দেন। আমারে কবে বিয়া দিবেন। আমার বিয়ে করার খুব শখ। বিয়ের পর জামাইয়ের কোলে বসে থাকব সারাদিন।
তুবা: যা এখনই এই বুড়ার কোলে উঠে পড়।
জুই: কি বলিস এসব। ছি:।
ঘটক: অবশ্য প্রস্তাব টা খারাপ না পরে ভাইবা দেখমু।
ঘটক মিয়া এসেছেন এই গ্রামের একমাত্র ফার্মেসি ডক্টর রুদ্রের কাছে তার মাথায় ব্যন্ডেজ করাতে।
রুদ্র তাকে দেখে বলল, কি ব্যপার ঘটক সাব। মাথা ফাটালেন কিভাবে?
ঘটক: আর বলো না। আজকাল পোলাপান যা দুস্ট হয়েছে।
রুদ্র: কেন কোন মেয়েকে পাটক্ষেতে যাওয়ার কথা বলছেন নাকি যে মাথা ফাটায় দিসে?
ঘটক: আরে বাপু! ওরকম কিছু না। তা ডাক্তার বিয়া করবা কবে?
রুদ্র লাজুক স্বরে বলে, আপনি যবে মেয়ে খুজে আইনা দিবেন। সেইদিন ই বিয়া করে নিবো।
ঘটক এবার কথা এগোয়। যেন সে তার বর্শিতে আটকাতে চায় রুদ্রকে।
ঘটক: তা তুবারে তোমার কেমন লাগে?
রুদ্র: ভালো। চেহারা মাশাআল্লাহ সুন্দর।
ঘটক: তুমি কোন চিন্তা করো না। আমি ওর পরিবারের লগে কথা বলবো।
রাতে ঘটক সাহেব আসাদ মিয়ার বাসায় আসে। দরজার ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে দেয় আসাদ মিয়া। ঘটককে দেখে ভেতরে আনে।
আসাদ মিয়া: আরে ঘটক সাব। কি মনে কইরা আমার বাসায় আসছেন। আসেন। আসেন। ভেতরে আসেন। তুবার মা ঘটক সাব আইসেন। ওনার জন্য চা নাস্তা আনো।
ঘটক : ( মনে মনে) যাক চা নাস্তা খাইতে পারবো। এমনিও অনেক ক্ষুদা লাগছে।
ঘটক মিয়া সোফায় বসে আছেন। উনার সামনে আসাদ মিয়া।
আসাদ মিয়া: তা ঘটকসাব কি মনে করে আমার বাসায় আসলেন?
ঘটক: আসলে একটা বিয়ার সম্মন্ধ নিয়া আইসিলাম। আপনার মেয়ে তুবার জন্য। মেয়ে মাশাআল্লাহ। আপনার অনেক বড় হইসে। বিয়া না দিলে দেখবেন পরে কোন ছ্যাড়ার লগে প্রেম কইরা পালায় গেছে।
আসাদ মিয়া: আরে! আমার মেয়ে ওমন না।
ঘটক: আরে কুদ্দুস ও একই কথা বলছিল। পরে কি হইলো তা তো নিজের চোখেই দেখলেন। তার মেয়ে অন্য ছেলের লগে পালাই গেল।
আসাদ মিয়া এবার খানিকটা চিন্তিত। চা আর বিস্কিট হাতে নিয়ে আসে তুবা।
ঘটক: ভালো আছো মা? কত বড় হইয়া গেছো।
তুবা মুখ বেঙ্চি দিয়ে চলে যায়। সে চায়ে চিনির বদলে লবন দিয়েছে ঘটক কে শিক্ষা দেওয়ার জন্য।
আসাদ মিয়া: তা আপনার কাছে কি কোন ভালো পোলা আছে?
ঘটক: আমগো গ্রামের ডাক্তার রুদ্র। খানি ভালো ছেলে। একটা সিগরেট পান কিছু খায় না। ওর ব্যপারে কি বলেন?
আসাদ মিয়া: সে কি বিয়ে করতে রাজি?
ঘটক: হ। রাজি। আপনি রাজি হলেই আনবো কাজী।
আসাদ মিয়া: তাহলে তাই করো।
ঘটক এবার চায়ে চুমুক দেয়। আর বুঝে চিনির বদলে লবন দেওয়া হইসে চা মুখে নিয়েই ঘর থেকে বের হয়ে থু দিয়ে সব বের করে দেয় চা।
ঘটক: এই মেয়ে তো খুব ডেন্জারয়াস।
কথাটা বলে সেখান থেকে চলে যায়।
রাতে তুবার ঘরে আসে তার বাবা আসাদ মিয়া। তুবা খাটে শুয়ে ছিল। তার পাশে বসে।
আসাদ মিয়া: তুবা। মা। তুমি তো এখন বড় হয়েছে। আর বড় হলে সবার ই বিয়ে দিতে হয়। আমরা তোমার ও বিয়ে দিচ্ছি। তোমার কি কোন মতামত আছে।
তুবা নিজের মতামত বলতে চায়। কিন্তু সে তার বাবাকে ভয় পায়। তাই চুপ করে থাকে। কিছু বলে না।
এভাবে বিয়ের দিন চলে আসে। প্যন্ডেল টানানো হয়েছে। চারিদিকে ঝিকিমিকি লাইট। স্ট্যাটে বসে আছে জামাই মুখে রুমাল। আহা। কি লজ্জা।
তুবাকেও বউ সাজিয়ে তার পাশে বসিয়ে দেওয়া হলো। সেখানে হঠাৎ নাচানাচি শুরু হয়ে গেল। গান বাজছে। আর ২ জন ছেলে নাচছে।
এমন সময় সেখানে হঠাৎ পুলিশ এসে পড়লো। ঘটক সাব পুলিশ দেখে আগেই লুঙ্গি খুলে দৌড় দিল। সবাই চুপচাপ।
কথা হচ্ছে পুলিশ কে ডাকলো?
তুবার বিয়ে এটা জুই তার স্কুলের ম্যডাককে বলে। তাই ম্যডাম বিয়ে থামাতে পুলিশ নিয়ে এসেছে।
পুলিশ: এই বিয়ে হবে না। বাল্যবিবাহ নিষেধ। এই শালা বর। ডাক্তার। তোর বয়স তো মনে হয় ৩০। তুই একটা কচি মেয়েকে বিয়ে করতে পারিস।
ডাক্তার রুদ্র ভয় পেয়ে গেল। বিয়ে করতে এসে বেচারা বিপদে পড়ে গেছে। তুবা এসব দেখে মুখ চেপে হাসছে।
রুদ্র বলল, পুলিশ স্যার। আমার ভুল হয়ে গেছে। মাফ করে দেন।
পুলিশ: কোন মাফ নেই। তোকে রিমান্ডে দিব। পেছন দিয়ে ডিম ভরে দিলে বিয়ের সাধ মিটে যাবে।
কথাটা শুনে রুদ্র ঢেউক গিল।
রুদ্র : স্যার। আমার একটু টয়লেট চেপেছে। আমি আসতেছি।
কথাটা বলে পাগলি খুলেই দৌড় দিল রুদ্র। তার পেছনে দুইজন পুলিশের সিপাহি বন্দুক হাতে দৌড় দিল।
দৌড়াতে দৌড়াতে রুদ্র ঘটককে পেল। ঘটকের অবস্থা খারাপ। উনার পড়নে শুধু আন্ডার ওয়ার। কোন লুঙ্গি নেই।
রুদ্র: ঘটক সাব। তাড়াতাড়ি দৌড় দেন। পুলিশ আইলো৷।
ঘটক তাড়াতাড়ি দৌড় দিতে গিয়ে পুকুরে পড়ে গেল। এদিকে বেচারা রুদ্র গিয়ে আশ্রয় নিল পাটক্ষেতে।
ঘটনা বিয়ে বাড়িতে।
পুলিশ: তো। আসাদ মিয়া। বর তো পালালো। এবার বলেন। কার সাথে বিয়ে দিবেন?
আসাদ মিয়া: আমার ভুল হয়েছে স্যার। আমি আর আমার মেয়ে কে বিয়ে দিব না।
এবার স্কুলের শায়লা ম্যডাম কথা বললেন, দেখেন তুবার বয়স ১৫। মাত্র টেনে পড়ে। অবশ্যই বিয়ে দিবেন। তবে ১৮ আগে নয়। বাল্যবিবাহের কারনে অনেক মেয়ে গর্ভপাত করে মারা যায়। জানেন?
আসাদ মিয়া এবার চুপ।
তখন সবাই মিলে বলল, আসুন। বাল্যবিবাহ রুখে দাড়াই। সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলে।
একটি সামাজিক গল্প
Rudro Siyam
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন