-- বন্ধুর বউ যখন খারাপ মেয়ে--
( রুদ্র সিয়াম )
খোকা: দোস্ত! তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে, তাড়াতাড়ি জিনজিরা আয়!
রাজ : কি সারপ্রাইজ? আর গত একমাস তুই কোথায় ছিলি? তোর কোন খোঁজখবর নাই? তোর পরিবার অনেক টেনসন করছে। তুই বাসায় ফিরে যা।
খোকা: দোস্ত! আমি না একটা কাজ করে ফেলেছি। কাউকে না জানিয়েই কাজটা করেছি, তুই তাড়াতাড়ি আয়। ফোনে সব কথা বলা যায় না। আমি তোকে সরাসরি বলতে চাই।
রাজ : কি করেছিছ তুই? দাড়া আমি এখুনি আসছি।
রাজ ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো সকাল ১০টা বাজে। আজ শুক্রবার। তার ছুটির দিন। তাই আস্তে ধীরে উঠে বাথরুমে ঢুকে গোসল করলো।
বাথরুম থেকে বের হতেই দেখলো ফোন বাজছে। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে খোকা বলল, দোস্ত! আর কতক্ষন লাগছে? এই রোদের মধ্যে আমি দাড়িয়ে আছি।
রাজ: এক কাপ চা খা, আমার আস্তে ২মিনিট লাগবে।
খোকা দাড়িয়ে আছে জিনজিরা ফেরিঘাটে। এখানের মালাই চা, খোকার খুব ভালোলাগে। সে চা খাচ্ছে আর অন্যহাতে বেনসন সিগারেট। খোকা সামনে তাকিয়ে দেখলো রাজ আসছে। আজ শুক্রবার। তাই রাজ কালো শার্ট পড়ে আছে, সবাই জানে শুক্রবারে সে কালো শার্ট পড়ে। আর এমন ভাবে কথা বলে যে অনেক রহস্যময় কথা।
রাজ খোকার সামনে এসে দাড়ালো।
খোকা: দোস্ত! আমি বিয়ে করে ফেলেছি।
রাজ : তা! তো! ভালো খবর। তা মিষ্টি কই?
খোকা: তুই আমার সঙ্গে বাসায় চল! তোকে তোর ভাবি মিষ্টি খায়িয়ে দিবে।
রাজ : বলিস কী? তাহলে তো যেতেই হয়।
রাজ ও খোকা একটা পাঁচতলা বিল্ডিংয়ের সামনে এসে দাড়ালো।
খোকা: এই বিল্ডিংয়ের ২য় তলায়।
দরজায় কলিংবেল বাজাতেই দরজা খুলে দিল আলবিনা। খোলা চুলে হাসি মুখে সে খোকাকে জড়িয়ে ধরলো। খোকার ঠিক পেছনে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে ছিল রাজ তাই আলবিনার মুখ সে দেখতে পেল না।
যখন রাজ মুখ তুলে তাকালো। তখন দেখলো এটা তো আলবীনা। যাকে সে এতো বছর ভোলার চেষ্টা করছে। যেই মেয়ে তার জীবন নষ্ট করে দিয়েছে। যার জন্য আজ সে পরিবার, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন।
রাজ ও খোকা বসে আছে সোফায়। আলবিনা চা বানাচ্ছে রান্না ঘরে।
রাজ: দোস্ত! আমার একটু কাজ আছে। আমি চলেই যাই।
খোকা: আজ তো শুক্রবার। আজ আবার কিসের কাজ। আজ সারাদিন তুই আমি আর আলবীনা মিলে ঢাকা শহর ঘুরে বেড়াবো।
রাজ: তোরা স্বামী স্ত্রী ঘুরতে যাবি। সেখানে আমি কি করবো বল?
খোকা: বউ পেয়ে কি তোকে ভুলে যাবো? তুই হলি আমার ছোটবেলার বন্ধু। আর আলবিনাকে তো আমি ২দিন ধরে চিনি।
এমন সময় আলবীনা চা নিয়ে আসলো। যখন ই সে রাজকে চা দিল। তার হাত ফসকে চা পড়ে গেল মেঝেতে। চায়ের কাপ ভেঙ্গে চা ছড়িয়ে পড়লো ফ্লোরে।
খোকা: দেখে শুনে কাজ করতে পারো না। চা ফেলে দিলে কেন? দোস্ত! তুই আমার কাপের চা খা। এমনিও আমি দোকান থেকে চা খেয়ে আসছি। এখন আর খাবো না।
রাজ খোকার হাত থেকে চায়ের কাপ নিল। আর চায়ে চুমুক দেওয়ার সাথে সাথেই তার অতীতের ঘটনা মনে পড়ে গেল। কীভাবে আলবীনার সাথে পরিচয়। কিভাবে প্রেম। তারপর বিচ্ছেদ।
২বছর আগের ঘটনা:
রাজ গিয়েছিল তার নানীর বাড়ি। সেখানে আলবীনার সাথে তার পরিচয়। আলবীনাকে প্রথম দেখাতেই তার ভালোলাগে, কিন্তু রাজ লাজুক স্বভাবের হওয়ার কারনে তা সে তার মনের কথা আলবীনাকে বলতে পারে না।
একদিন রাজ সাহস করে আলবীনার সামনে দাড়ায়। তারপর মাথানিচু করে।
রাজ: কলপাড়ের পেছনে দেখা করো সন্ধার পরে!
সন্ধার পর রাজ খুশি মনে কলপাড়ের পেছনে যায় । গিয়ে দেখে আলবীনা অন্য ছেলের সাথে রোমান্স করছে। ছেলেটা তার ঘাড়ে, কাধে চুমু খাচ্ছে আর অন্য হাত দিয়ে বুক নিয়ে খেলছে।
এটা দেখে রাজের মন ভেঙ্গে গেল। রাজ ভালোবেসে ভালোবাসা পায় নি, আর অন্যকাউকে আলবীনা নিজের শরীর দিয়ে দিল।
রাজ মনে মনে বলল,
আমি তো তোমার শরীর চাই নি, একটু মন চেয়েছিলাম।
" আমার সবটুকু বিশ্বাস যে দিয়েছে ভেঙ্গে,
তাকে কৃতজ্ঞতা জানাই,
সে দিয়েছে আমায় অন্ধ চোখে আলো! "
রাজ এবার কল্পনা থেকে বাস্তবতায় ফিরে আসে। এই সেই আলবীনা, ছলনাময়ী মেয়ে। যে তার জীবন নষ্ট করে দিয়েছে। এখন যে করেই হোক! খোকাকে আলবীনার হাত থেকে বাচাতে হবে।
আলবীনা শাড়ি পড়ে মেঝে পরিষ্কার করছিল। আর একটু পর পর ঝুকে যাচ্ছিল। যার কারনে রাজের চোখ না চাইতেও সেখানে চলে যাচ্ছিল। আলবীনা হচ্ছে এমন মেয়ে যে সবাইকে নিজের প্রতি আকর্ষণ করাতে চায়। সে চায় পুরুষরা যাতে তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে থাকুক। সে সবাইকে তার মায়ায় জড়াতে চায়।
খোকা: দোস্ত! আলবীনার সাথে কীভাবে প্রেম হলো? শুনবি?
রাজ: আমার প্রেমের গল্প ভালোলাগে না।
খোকা: তুই কখনও প্রেম করস নাই, তাই জানিস না যে প্রেমের কি মজা।
রাজ: আমি করতেও চাই না!
খোকা: তবুও আমার প্রেমের গল্পটা শোন!
খোকা: আমার আর আলবীনার প্রেম ফেসবুকে, ১ বছর আগের ঘটনা। তুই তো জানিস ই আমি ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছিলাম। তখন আমার জীবনে আলবীনা আসে। সে আমাকে আবার নতুন করে বাচতে শেখায়। ওর সাথে কথা বললে আমার মন ভালো হয়ে যেত, আর কথা না বললে তীব্র মন খারাপের শিকার হতাম। তারপর একদিন আলবীনা বলে দেখা করতে। তারপর আমরা দেখা করি। দেখা করার প্রথম দিন ই আলবীনা আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু দিতে থাকে, আমিও তখন কন্ট্রোল হারাই।
রাজ: তারপর?
খোকা: আমি চাইলে ওকে খেয়ে ছেড়ে দিতে পারতাম। কিন্তু আমি তা করিনি। তারপর গতমাসে আমরা পালিয়ে বিয়ে করি।
রাজ: তুই কাজটা মোটেও ঠিক করিসনি, অজানা অচেনা একটা মেয়ের জন্য নিজের পরিবারকে ছেড়ে চলে এসেছিছ। তুই জানিস আংকেল আন্টি কত কষ্টে আছে। তুই শুধু নিজের স্বার্থটাই দেখলি নিজের পরিবারের কথা একবারও ভাবলি না।
খোকা (রেগে) : আমার বা#*৳&#& পরিবার। পরিবার খালি চায় টাকা আর টাকা। আমি কি টাকার মেশিন। ওনারা আমাকে জন্মই দিছে টাকার জন্য। আমি ডিপ্রেশনে আছি নাকি মইরা গেছি। ওইটা দেখবো না। ওনাদের শুধু টাকা চাই। এতোই যদি টাকা লাগে, তবে আমাকে জন্ম না দিয়ে সেই টাকা ব্যাংকে জমালেই তো পারতো। তাহলে এখন বুড়া বুড়ি বসে বসে খেতে পারতো।
রাজ: ছি: তুই নিজের পরিবার নিয়ে এতো বাজে কথা বলতে পারলি। আর আমার দিকে তাকিয়ে দেখ। আমার কোন পরিবার নেই। ছোটবেলায় বাবা মা মারা গেছে। বড় হয়েছি ফুপুর কাছে। এখন আমার কষ্টটা দেখলি না?
পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরালো খোকা।
খোকা: তোর পরিবার নাই, তুই ভালোই আছোস। এখন বাদ দে এসব কথা। আমি তোর সাথে ঝগড়া করতে চাই না। এই আলবীনা! রেডি হও। আমরা ঘুরতে বের হবো।
একটা রিক্সাতে ৩ জন বসা যায় না। তবুও রাজ বসেছে রিক্সার ওপড়ের সিটে। নিচের সিটে বসেছে খোকা, আর তার পাশেই বসেছে। খোকার নতুন বিয়ে করা বউ আলবীনা। কে জানি রাজ খোকা ও আলবীনা কে পাশাপাশি দেখে হিংসে করছে, তার রাগে শরীর আগুনে জ্বলছে। এর মানে কী? সে এখনও আলবীনাকে ভালোবাসে?
কবি বলেছেন সত্যিকারের প্রেম আজীবন থাকে। আর যেটা ভালোলাগা বা মোহ। সেটা সময়ের সাথে সাথে কমতে শুরু করে। একসময় দেখা যায়। দুজন দুজনকে দেখতে পারছে না। তারপর শুরু হয় ঝগড়া আর এই ঝগড়া থেকেই বিচ্ছেদ।
রাজ মনে মনে বলল: যদি খোকা আর আলবীনার বিচ্ছেদ হয়। তবে ভালোই হবে।
রিক্সা এসে থামলো জাতীয় চিড়িয়াখানার সামনে। রিক্সা থেকে একে একে সবাই নামলো। রাজ নামতে গিয়ে তার হাত ভুলে স্পর্শ করলো আলবীনার বুকে। রাজ ভয় পেয়ে তাকালো আলবীনার দিকে। আলবীনা তাকে দেখে হাসলো।
খোকার হাত ধরে আলবীনা হাটছে। এমন ভাবে হাটছে যেন আলবীনা নিজের শরীরের সাথে লেপ্তে যাচ্ছে খোকার শরীর। রাজ পেছন পেছন আসছে। আর তার কেন জানি খুব রাগ উঠছে।
আলবীনা একটা হরীণ দেখিয়ে বলল: ওই দেখো! কত সুন্দর হরিন।
খোকা: এমন ভাবে বললা যেন জীবনে হরীন দেখ নাই। তোমার বাচ্চামী স্বভাব বাদ দাও। বিয়ে করছো। ২দিন পর নিজে বাচ্চার মা হবা।
আলবীনা মুখে হাসছে।
আলবীনা: আমাদের বাচ্চা হলে কী নাম রাখবে?
খোকা: আমাদের বাচ্চার নাম হবে টুনটুনি।
আলবীনা: এসব পুরানো যুগের নাম আমি রাখব না। রাজ ভাই আপনি একটা নাম বলেন।
এই প্রথম সে রাজের সাথে কথা বললো। রাজ অন্য মনস্থ হয়ে কি যেন ভাবছিল। হঠাৎ প্রশ্নে ভড়কে গেছে। তাও নিজেকে সামলে নিল।
রাজ: আলবীনা নামের সাথে মিলিয়ে অনেক নাম হয়। যেমন: আলেয়া, অবন্তী, আলভী।
আলবীনা: খুবই কাব্যিক নাম। তবুও কেন জানি নামগুলো ভালো লাগলো। আচ্ছা! আপনি কী কবি?
রাজ : না! আমি কবিতা লিখতে পারি না। তবে মাঝে মাঝে গল্প লিখি। সেগুলো ইউটিউবে আপলোড দেওয়া হয়। সেখান থেকে আমি কিছু টাকা পাই। এভাবেই কোনমতে দিন চলে।
রাজ ও আলবীনার কথা শুনে যে কেউ ভাববে। এরা আগে কেউ কাউকে চিনতো না। আসলে খোকা সাথে সাথে থাকায় দুজনই খুব ভালো অভিনয় করছে। এমন ভান করছে যে কাউকে চিনে না। আসলে তারা দুজনই দুজনকে ভালো করেই চিনে।
হঠাৎ খোকার ফোন বেজে উঠলো।
খোকা: জ্বী!
আচ্ছা!
ঠিক আছে!
আমি অবশ্যই যাবো।
না! না! কোন অসুবিধে নেই।
ফোন কেটে দিল খোকা!
খোকা: দোস্ত! আমার তো ইন্ডিয়া যেতে হবে মাল আনতে। তোকে তো বলিনি। আমি চকবাজারে দোকান দিয়েছি। এখন সেখানে ব্যবসার বাজার ভালো।
আলবীনা: তুমি চলে গেলে আমি একা কিভাবে থাকবো?
রাজ: সমস্যা নেই ভাবী! আমি আছি তো!
খোকা: আমার বন্ধু রাজ থাকবে তোমার সাথে। মাত্র ৩দিনের কাজ। আমি প্লেনে যাবো আর প্লেনে আসবো।
রাজ: আমাকে এখুনি যেতে হবে। চল এয়ারপোর্ট যাই।
এয়ারপোর্ট দাড়িয়ে আছে রাজ, খোকা ও আলবীনা। আলবীনা খোকাকে জড়িয়ে ধরে কাদছে।
খোকা: এতো ন্যাকামি করার কি আছে? আমি কি মরে গেছি যে কান্না করতাছো? চোখের পানি মুছো।
আলবীনা: তাড়াতাড়ি ফিরে এসো। তোমাকে ছাড়া আমি এক সেকেন্ড ও থাকতে পারব না।
এসব দেখে রাজ মনে মনে আলবীনাকে গালি দিল।
রাজ মনে মনে বলল: ভালোই একটিং পারো আলবীনা। তবে আমিও তোমার থেকে কম কী? আমার বন্ধুকে সরল সোজা পেয়ে কিভাবে পটিয়েছো। আমি সবই বুঝতে পারছি। বাসায় চলো, তখন তোমার সাথে আমার হিকাস নিকাস হবে।
খোকা প্লেনে চড়ে চলে গেল কলকাতা। আর খোকার বাসায় ফিরে এলো রাজ ও আলবীনা।
রাজ সোফায় বসে টিভি দেখছে আর চানাচুর খাচ্ছে। আলবীনা তার পাশে এসে বসলো।
রাজ: এবার আসল কথায় আসা যাক! আলবীনা! আমার বন্ধুর পেছনে পড়লে কেন? ও তোমার কি ক্ষতি করেছে?
আলবীনা: তোমার বন্ধুকে আমি ভালোবাসি।
রাজ: তোমার মুখে ওসব কথা মানায় না, তুমি একটা খারাপ মেয়ে।
আলবীনা: হ্যা! তুমি ঠিকই বলেছো। কিন্তু একটা মেয়ে শুধু শুধু খারাপ হয় না। তার খারাপ হওয়ার পেছনের গল্প জানলে, তুমি কাদতে বাধ্য হবে।
রাজ: আমি জানতে চাই। কী সেই গল্প?
আলবীনা: দাড়াও! আমি তোমাকে সেই গল্প বলবো। কিন্তু তোমাকে আমার শর্ত মানতে হবে।
রাজ: কি সেই শর্ত?
আলবীনা: গল্পটা শেষ করার পর। তোমাকেও আমার সাথে মিলিত হতে হবে।
রাজের মাথার ওপর আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। এসব কি বলে আলবীনা। সে এতোই খারাপ মেয়ে। তা রাজ কল্পনাও করতে পারে নি। কোনমতে নিজের রাগ সামলে নিল রাজ।
রাজ: আচ্ছা! ঠিক আছে। এখন তোমার ঘটনা বলো।
আলবীনা: মেয়েদের জীবন সম্পর্কে তোমরা ছেলেরা কী জানে? কিছুই না। আমি ছোটবেলা থেকে শারীরিক ভাবে নির্যাতিত হয়ে আসছি। আমার যখন ৬বছর আমার খালাতো ভাই আমার শরীরে হাত দেয়। আমার যখন মাত্র ১২ বছর তখন পাশের বাসায় এক বড় ভাই আমাকে তার রুমে নিয়ে যায়। তারপর রুমের দরজা লাগিয়ে দেয়। সেই ঘটনার পর আমি এতোই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম যে ছেলেদের প্রতি আমার বিশ্বাস উঠে যায়। তোমরা সব ছেলেরাই খারাপ। যখন আমি সেই ঘটনা মা কে বললাম। উনি বিচার তো করলেন ই না। উল্টো আমাকে মারধর করতে লাগলেন। আমার কী অপরাধ? আমি সুন্দর এটাই কি আমার অপরাধ?
আমার কি ইচ্ছে করে না একটু হাসিখুশি বাচতে? আমিও তো মানুষ। তবুও কেন সবাই তা ভুলে যায়।
সেদিনের পর থেকেই আমি খারাপ হয়ে উঠি তা না! আমার বয়স যখন ১৫। তখন ক্লাসের শিক্ষক আমাকে একা তার কক্ষে ডাকলেন। আমি ভয়ে ভয়ে তার রুমে যাই। আমার সেই গণিত শিক্ষক ছিলেন খুবই রাগি মানুষ। উনাকে সবাই সাইকো বলতো। উনার রাগ উঠলে উনি কি করতো? তা উনি নিজেও জানতেন না। সেদিন উনিও আমার বুকে হাত দিলেন। তারপর রেপ করলেন আমাকে।
রাজ: আমি আর শুনতে চাই না! আমার মাথাব্যথা করছে। তুমি কি আমাকে এককাপ চা খাওয়াতে পারবে?
আলবীনা: অবশ্যই! তবে তোমাকে যে পুরো ঘটনা শুনতে হবে। না হলে তো সবাই আমাকেই খারাপ ভাববে আজীবন। তুমি তো আবার লেখক। তুমি না হয়! আমার গল্পটা বিশ্ববাসী কে জানিয়ে দিও। যে আমি এমনি এমনি খারাপ হইনি। পরিবেশ, সমাজ আমায় খারাপ বানিয়ে দিয়েছে।
রাজ: আমি তো ছন্মনামে লেখালেখি করি। সেখানে আমার নাম 'রুদ্র সিয়াম'। তুমি ফেসবুকে সার্চ দিলেই পাবে।
৫ মিনিট পরের ঘটনা:
রাজ একটার পর একটা সিগারেট টানছে। তার মাথা হ্যাং হয়ে গেছে। সে কি করবে বুঝতে পারছে না। একধরনের চাপ অনুভব করছে মাথায়। মনে হচ্ছে মাথা এখনি ফেটে যাবে।
আলবীনা: এই যে তোমার চা!
রাজ চা হাতে নিল।
আলবীনা: তাহলে বাকি গল্প শুরু করি।
রাজ চায়ের কাপে চুমুক দিল।
রাজ: এখন আমার একটা প্রশ্ন? এতোকিছু হওয়ার পরও কেন তুমি কখনও কোন প্রতিবাদ করলে না?
আলবীনা: কারন আমি যখন প্রথমবার প্রতিবাদ করি। মানে আমার সাথে ঘটা ঘটনা মা কে বলি। মা প্রতিবাদ তো করেন ই না। উল্টো আমাকে বলেন চুপ থাকতে। তিনি আমাকে চুপ করানোর জন্য আমার হাতে খুর্চুন আগুনে দাগ।
আলবীনা তার হাতের দাগ দেখালো রাজকে।
রাজ: তোমাকে শান্তনা দেওয়ার মতো ভাষা আমার কাছে নেই, তবে তোমার সাথে যা হয়েছে। তা সত্যি ই খুব দুঃখজনক। আশা করি, এমনটা আর কারো সাথে না হোক!
আলবীনা কাঁদছে। রাজের চোখও কিছুটা ভিজে উঠেছে। সে তার ভেজা চোখ আলবীনাকে দেখাতে চায় না। এভাবে কত রাত সে কেদেছে এক অজানা কারনে।
২ দিন পর:
আলবীনা অপেক্ষা করছে রাজের জন্য। কিন্তু রাজ গত দুদিন ধরে নিখোঁজ। তার বাসা কোথায়? তা আলবিনা জানে না। তাই বাসায় যেতে পারছে না। রাজ বলেছিল যে সে আলবীনার গল্প শোনার পর তার সাথে রাত কাটাবে। কিন্তু সেদিন রাজ যে খোকার ঘর থেকে বের হলো আর তার দেখা নেই। আলবীনা খোকার থেকে রাজের ফোন নাম্বার নিয়েছে। কিন্তু সেখানেও রাজের ফোন বন্ধ!
আলবিনা দরজা খুলতেই দেখলো খোকা দাড়িয়ে আছে। আলবিনা খোকাকে জড়িয়ে ধরলো।
খোকা: আরে! ছাড়ো তো! এই গরমের মধ্যে কুলাকুলি করতে ভালোলাগে না। তুমি যাও এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে আসো। আর তারপর এক কাপ চা।
আলবিনা: তুমি না আমাকে একটুও ভালোবাসো না। বিয়ের আগে একরকম ছিলে, আমার সাথে কথা না বলে থাকতেই পারতে না। আর এখন গত ২ দিনে তুমি আমাকে একটাও কল দাওনি।
খোকা: কাজের খুব চাপ। মাথায় যখন ৫০ কেজির আলুর বস্তা থাকে। তখন প্রেম ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়।
আলবিনা: তুমি কি বললে? আমি আলুর বস্তা? আর তুমি তাহলে পচা বেগুন।
খোকা: এতো সবজি থাকতে পচা বেগুন ই কেন?
আলবিনা: তা তুমি বুঝবে না। ও ভালো কথা রাজের কোন খবর জানো?
রাজ আত্মহত্যা করেছে। গলায় ফাসি দিয়েছে। কেন আত্মহত্যা করেছে, তা কেউ বুঝতে পারছে না। পুলিশ তার লাশ সিলিং ফ্যানের ওপর থেকে নামালো। এটাকে ময়না তদন্তে পাঠানো হবে।
খোকা রাজের বাসার সামনে আসতেই দেখলো সেখানে মানুষের ভিড়। সেই ভিড়ের মধ্যে কোন মতে সে ভেতরে প্রবেশ করলো। এক পুলিশ তাকে আটকে দিল।
খোকা: এখানে কি হয়েছে?
পুলিশ: একজন আত্মহত্যা করেছে।
খোকা: ছেলেটির নাম কী?
পুলিশ: ছেলেটির নাম রাজ।
খোকা: আমি রাজের বন্ধু!
পুলিশ: তাহলে আপনি ভেতরে আসুন।
খোকাকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে ডিবি'র বড় অফিসার বসে আছেন। ওনার নাম আলী আকবর।
আলী আকবর একটা সিগারেট ধরালেন।
আলী আকবর: আপনি রাজের বন্ধু?
খোকা: জি।
আলী আকবর: আপনার বন্ধু কেন সুইসাইড করলো জানেন?
খোকা: না!
আলী আকবর: সে মৃত্যুর আগে একটা সুইসাইড নোট রেখে গেছে। আপনি কি সেটা পড়তে চান?
খোকা : অবশ্যই।
খোকা রাজের লেখা সুইসাইড নোট পড়ছে। সেখানে রাজ লিখেছে।
" মানুষ শুধু শুধু আত্মহত্যা করে না। তার পেছনে অনেক কারন থাকে। আমি একজন ব্যর্থ মানুষ। আমি যাই করেছি। জীবনে শুধু ব্যর্থটা পেয়েছি। মানুষ যখন ব্যর্থ হয়। তখন সে ভেঙ্গে পড়ে, আবার উঠে দাড়ায়। আমি এই জীবন যুদ্ধে হেরে গেছি। আমাকে তোমরা ক্ষমা করো। আমার জীবন কাহিনী শুনলে যেকেউ কাদতে বাধ্য হবে। ছোটবেলায় বাবা মায়ের মৃত্যু, তারপর এসএসসি তে ফেইল, প্রেমে ব্যর্থ, করোনা লকডাউন, এসব দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত! আমি বাচতে চেয়েছিলাম। আট দশটা স্বাভাবিক মানুষের মতো। কিন্তু আমাকে বাচতে হয়েছিল কুকুরের থেকে নিম্ন অবস্থায়। আমি যার কাছেই গিয়েছি। সেই আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে, আমাকে ধোকা দিয়েছে। কারো কাছে আমি একটুও সুখ পাইনি। আমি সুখের আশায় বেচে ছিলাম। কিন্তু দুঃখ হতাশা আমাকে কখনও ছাড়েনি! একবার নিজের মানসিক ডাক্তার দেখিয়েছিলাম।
ডাক্তার: তোমার বাইপোলার ডিসোর্ডার আছে।
আমি (রাজ) : সেটা আবার কী?
ডাক্তার: তোমার কি কখনও খুব বেশি মন খারাপ হয়?
আমি বললাম, হ্যা!
ডাক্তার: আবার খুব বেশি মন ভালো হয়ে যায় হঠাৎ করেই?
আমি: জী!
ডাক্তার : সাধারনত মানুষের মন খারাপ বেশিক্ষণ থাকে না, ২,৪,১০ মিনিট। কিন্তু এই রোগে ভুগতে থাকা রোগীর ডিপ্রেশন দিন দিন বাড়ে আর তার আত্মহত্যা করতে চায়। কেউ কেউ নিজের হাত কাটে। সাময়িক সুখের জন্য।
চিরকাল কেউ থাকে না, আজ মারা গেলে। মানুষ কাল তোমার খবর কেউ নিবে না।
'আবার আসিব ফিরে ধান সিড়িটির তীরে,
হয়তো মানুষ নয়, হয়তোবা শঙ্খচিল শালিকের বেশে! '
- জীবনানন্দ দাশ
(সমাপ্ত)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন